দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে জাতিগত পরিচয় এবং দেশপ্রেমের বিতর্কটি বেশ পুরোনো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা জনগোষ্ঠীর ভূমিকা এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তাদের করুণ পরিস্থিতি একটি বিশাল বৈপরীত্যের জন্ম দিয়েছে। যেখানে বাংলাদেশে চাকমারা রাষ্ট্রের সবোর্চ্চ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য আন্দোলন করছে এবং রাষ্ট্রের মূল জনগোষ্ঠীকে ‘সেটেলার’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে, সেখানে পাশের দেশ ভারতেই তারা বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়ে ‘চায়নিজ’ বা ‘নেপালী’ হিসেবে লাঞ্ছিত হচ্ছে। এই দ্বিমুখী আচরণ এবং বাংলাদেশের প্রতি তাদের অকৃতজ্ঞতা আজ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের রূঢ় বাস্তবতা: অ্যাঞ্জেল চাকমার মৃত্যু ও বর্ণবিদ্বেষ গত ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ত্রিপুরার আগরতলায় এক শোকাবহ ক্যান্ডেল মার্চ অনুষ্ঠিত হয়। টিপরা স্টুডেন্টস ফেডারেশনের (TISF) নেতৃত্বে আস্তাবল থেকে রাজবাড়ি গেট পর্যন্ত বিস্তৃত এই মিছিলে মানুষের হাতে ছিল বিচারের দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড। যেখানে প্রতিবাদকারীরা বলেন, “আমরা ভারতীয় নয়? আমাদের চায়নিজ বলবে কেন? NorthEast কে কেন আপনারা চিনবেন না?” কেন এই শোক? কারণ, উত্তর-পূর্ব ভারতের এমবিএ ছাত্র অ্যাঞ্জেল চাকমা সম্প্রতি ভারতের মাটিতেই বর্ণবিদ্বেষী হামলার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।

গত ৯ ডিসেম্বর উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে একদল স্থানীয় যুবক ২৪ বছর বয়সী অ্যাঞ্জেল চাকমা ও তার ভাইকে ‘চায়নিজ’, ‘চিনা’ এবং ‘নেপালী’ বলে গালিগালাজ করে। এক পর্যায়ে তর্কের জেরে রড ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়। দীর্ঘ ১৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ২৬ ডিসেম্বর অ্যাঞ্জেল মারা যান। এই ঘটনা প্রমাণ করে, ভারতে চাকমারা নাগরিকত্ব পেলেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে তারা আজও ‘ভারতীয়’ হিসেবে স্বীকৃত নয়। সেখানে তাদের পরিচয় কেবলই ‘বিদেশি’ বা ‘চায়নিজ’ সদৃশ এক যাযাবর গোষ্ঠী।
ভারতের নাগরিকত্ব বিতর্ক ও চাকমাদের অবস্থান: ভারতের অরুণাচল প্রদেশে বসবাসরত চাকমা ও হাজংদের নাগরিকত্ব পাওয়ার লড়াইটি দীর্ঘদিনের। ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট নাগরিকত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিলেও স্থানীয় জনজাতিদের প্রবল বিরোধিতার কারণে ভারত সরকার বারবার পিছু হটেছে। ২০১৭ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রী প্রেমা খাণ্ডুর উপস্থিতিতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হলেও স্থানীয়দের দাবি ছিল—চাকমাদের নাগরিকত্ব দিলে তারা সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে।
এমনকি ২০২২ সালের ৩১ জুলাই অরুণাচল প্রদেশ সরকার চাংলাং জেলায় চাকমা এবং হাজংদের জন্য জারি করা ‘রেসিডেন্সিয়াল প্রুফ সার্টিফিকেট’ (RPC) স্থগিত করে। ভারতের মাটিতে তারা আজও অস্তিত্বের সংকটে এবং অধিকারহীনতার ভয়ে দিনাতিপাত করছে। অথচ বিস্ময়করভাবে, এই চাকমাদেরই একটি উগ্র অংশ বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার স্বপ্ন দেখে। প্রশ্ন জাগে, যে দেশে তাদের ‘চায়নিজ-নেপালী’ বলে পিটিয়ে মারা হয়, সেই দেশ নিয়ে তাদের এত মোহ কেন?
বাংলাদেশে চাকমাদের ‘আধিপত্যবাদী’ উত্থান: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চাকমাদের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংবিধান থেকে শুরু করে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পর্যন্ত, রাষ্ট্র সবসময়ই এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তারা স্বীকৃত ‘উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’। এই স্বীকৃতির আড়ালে তারা শিক্ষা, চাকরি এবং রাজনীতিতে যে পরিমাণ কোটা ও বিশেষ সুবিধা ভোগ করেছে, তা বাংলাদেশের মূলধারার মানুষের চেয়েও বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে চাকমা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। আজ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সচিবালয় থেকে শুরু করে বৈদেশিক মিশন, রাজনীতি থেকে প্রশাসন—সবখানেই চাকমাদের একচ্ছত্র দাপট। বর্তমান বাংলাদেশে চাকমা মন্ত্রী আছেন, এমপি ছিলেন, এমনকি আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে তারা স্বায়ত্তশাসনের স্বাদও গ্রহণ করছেন। তবুও তারা সন্তুষ্ট নয়।
আদিবাসী বিতর্ক ও অকৃতজ্ঞতার ইতিহাস: ২০০৭ সালে জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্রের পর থেকে চাকমারা নিজেদের ‘উপজাতি’ পরিচয়ের বদলে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই দাবির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ উদ্দেশ্য। ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি পেলে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ পাবে এবং ৪০০০ বছরের প্রাচীন বাঙালি জাতিকে ‘সেটেলার’ বা ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করার আইনি ভিত্তি পাবে। ইতোমধ্যে চাকমারা বাঙালিদের সেটেলার বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে এবং কেউ চাকমাদের উপজাতি বললে ক্ষেপে তেড়ে আসে।
ইতিহাস বলছে, চাকমারা মূলত মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর একটি শাখা, যারা ১৬০০-১৭০০ সালের দিকে মঙ্গোলীয়- তিব্বত থেকে যুদ্ধে বিতাড়িত হয়ে যাযাবর হিসেবে ভারতের সেভেন সিস্টার এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিল। অধিকাংশ চাকমা মনে করেন, তাদের আদিনিবাস চম্পকনগর। ব্রিটিশ আমলেও তাদের ‘অভিবাসী’ বা ‘শরনার্থী’ হিসেবে গণ্য করা হতো। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর চাকমাদের একটি বড় অংশ পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) কে মেনে নিতে পারেনি। তারা ভারতকে লালন করে। যারা মাত্র ২০০ বছর আগে যাযাবর হিসেবে এদেশে এসেছে, তারা আজ হাজার বছরের ভূমিপুত্র বাঙালিদের ‘সেটেলার’ বলে গালি দিচ্ছে। এটি কি কেবল পরিচয় সংকট, নাকি চূড়ান্ত পর্যায়ের অকৃতজ্ঞতা?
রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদ
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশে রাজকীয় সুবিধা ভোগ করার পরও চাকমাদের একাংশ রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। প্রজ্ঞা তাপস চাকমা (পিটি চাকমা) বা বৌদ্ধ ভিক্ষু ভাগ্য চাকমা (মনোগিত জুম্মা) মতো ব্যক্তিরা প্রকাশ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের অংশ বলে দাবি করছেন। চাকমা সশস্ত্র গ্রুপগুলো প্রতিনিয়ত অস্ত্র সংগ্রহ করছে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে আলাদা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনী ও বাঙালির সঙ্গে সংঘর্ষে কোনো সন্ত্রাসী বা চাকমা নিহত হলে তখন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মাধ্যমে প্রচার করা হয়, “বাংলাদেশ সংখ্যালঘুদের জন্য নিরাপদ নয়।” অথচ ভারতে যখন একই জনগোষ্ঠীর একজন নিহত হয়, তখন এ বিষয়ে তেমন কোনো আলোচনা বা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় না। পার্বত্য চট্টগ্রামে আমরা বহু ঘটনার সাক্ষী—উপজাতি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সৃষ্ট দাঙ্গা, গোলাগুলিতে হতাহতের পর রাষ্ট্র এবং স্থানীয় বাঙালিদের দায়ী করা হয়। এই দ্বৈত মানদণ্ড এবং সংবাদ প্রচারের বৈষম্য স্পষ্টভাবে দেখায় যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনা রাজনৈতিক ও জাতিগত স্বার্থের সঙ্গে মিশে গেছে, যেখানে তথ্য এবং বাস্তবতা বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। কিছু দেশী-বিদেশী মদদপুষ্ট মিডিয়া, এনজিও, দাতা সংস্থা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি উপজাতি নেতৃত্বশ্রেণীকে এই কাজে সহায়তা করে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র চাকমাদের যে নিরাপত্তা, অন্ন, বস্ত্র এবং আভিজাত্য দিয়েছে, পৃথিবীর কোনো দেশেই কোনো সংখ্যালঘু উপজাতি তা পায় না। অথচ সেই সুবিধাগুলো ভোগ করে তারা ভারতের প্রতি আনুগত্য দেখাচ্ছে, যেখানে তাদের পরিচয় কেবলই ‘চায়নিজ’, ‘নেপালী’। এটি কি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার ফল? নাকি চাকমাদের সহজাত অকৃতজ্ঞতার প্রকাশ? অনেক চাকমা পণ্ডিতের মতে, চাকমারা ঐতিহাসিকভাবেই যাযাবর এবং স্বার্থপর জাতি, যারা কোনো দেশে স্থায়ীভাবে থিতু হতে পারেনি এবং যেখানেই গেছে সেখানেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।
ভারতের মাটিতে যখন চাকমারা ‘চায়নিজ’, ‘নেপালী’ গালি শুনে মৃত্যুবরণ করে, তখন বাংলাদেশের মাটি তাদের নিরাপত্তা দেয়। কিন্তু সেই নিরাপত্তার সুযোগ নিয়ে যখন তারা দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানে এবং বাঙালিদের অবজ্ঞা করে, তখন সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। ‘আদিবাসী’ সাজার নামে তারা আসলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি পৃথক রাষ্ট্রে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদী নীল নকশা বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রের উচিত এই উগ্রবাদ ও অকৃতজ্ঞতাকে কঠোর হস্তে দমন করা। পরিচয় সংকটে ভোগা এই জনগোষ্ঠীর বোঝা উচিত—ভারত তাদের আপন নয়, আর বাংলাদেশ তাদের জন্য কোনো ‘পরিত্যক্ত চারণভূমি’ নয়।



