পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণের দ্বিচারিতা: একটি অস্বস্তিকর সত্য।

0
ছবি সংগৃহীত: নিক্সন চাকমা

চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস নামে পরিচিত পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ নিয়ে আলোচনা করলে একটি স্পষ্ট দ্বিচারিতা চোখে পড়ে। কিছু তথাকথিত সুশীল এবং উপজাতি সংগঠনগুলো প্রায়শই দাবি করে যে ধর্ষণ শুধুমাত্র বাঙালি সম্প্রদায়ের লোকেরা করে, যখন পাহাড়ি উপজাতিরা এমন অপরাধ থেকে মুক্ত। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই? যখন কোনো বাঙালি জড়িত ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, তা রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে। সংগঠনগুলো যেমন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), হিল উইমেন্স ফেডারেশন এবং যুব ফোরাম মিলে প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করে, সভা-সমাবেশ করে এবং বাঙালি সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে ধর্ষকের তকমা দেয়। এমনকি জেএসএস (সন্তু গ্রুপ) এর মতো গ্রুপও এতে যোগ দেয়। এই ঘটনাগুলোকে ব্যবহার করে তারা পাহাড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, শান্তি-সম্প্রীতি নষ্ট করে এবং জাতিগত বিভেদ গভীর করে। শুধু তাই নয়, বাঙালিদের ভূমি দখলদার এবং ধর্ষক হিসেবে জাতিসংঘে নালিশ করে।

কিন্তু যখন ধর্ষণের শিকার হয় স্বজাতির কোনো নারী এবং অভিযুক্ত হয় পাহাড়ি উপজাতির কোনো সদস্য, তখন এই সংগঠনগুলো রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ থাকে। ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। যদি ভিকটিম অভিযোগ করে, তাহলে তাকে এবং তার পরিবারকে জরিমানা বা সমাজচ্যুত করা হয়। এই দ্বিচারিতা কেন? এটি কি রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য, নাকি সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অংশ? এই প্রতিবেদনে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব, বিশেষ করে একটি সাম্প্রতিক ঘটনার আলোকে, যা এই দ্বিচারিতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণের ঘটনা নতুন নয়। বিগত বছরগুলোতে অনেক অভিযোগ উঠেছে যে বাঙালি এবং সেনাবাহিনী জড়িত। এই অভিযোগগুলো প্রায়শই রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যে ব্যবহার হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো একটি ধর্ষণ চেষ্টা বা কথিত ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে, তা দিয়ে সমগ্র বাঙালি সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো এই ঘটনাগুলোকে ব্যবহার করে পাহাড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ফলে জাতিগত বিভেদ বাড়ে, শান্তি ভঙ্গ হয় এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নালিশ করা হয়। কিন্তু এই একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি কতটা সত্য? আমরা দেখি যে পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মধ্যেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, কিন্তু তা প্রকাশ্যে আসে না। কারণ? আঞ্চলিক সশস্ত্র দল কর্তৃক সামাজিক চাপ এবং রাজনৈতিক স্বার্থ। পাহাড়ি সংগঠনগুলো নিজেদের সম্প্রদায়কে ‘নির্দোষ’ হিসেবে দেখাতে চায়, যাতে বাঙালিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সুবিধা পায়। এটি একটি বিপজ্জনক খেলা, যা নারীদের নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

এখন আসুন একটি সাম্প্রতিক ঘটনার দিকে নজর দিই, যা এই দ্বিচারিতার একটি স্পষ্ট প্রমাণ। রাঙামাটিতে একজন পাহাড়ি নারীকে ধর্ষণ করে সেই ঘটনার স্থিরচিত্র এবং ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে সেগুলো দেখিয়ে দীর্ঘদিন মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে এবং অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেন স্বামী-স্ত্রী: নিক্সন চাকমা (৪০) এবং অনুরাধা চাকমা (৩৭)। নিক্সন চাকমা সোনালী ব্যাংকের রিজার্ভ বাজার শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার। ভিকটিম চন্দনা চাকমা (ছদ্মনাম, ৪২) আর্থিক প্রয়োজনে ব্যাংকে ঋণ নিতে গিয়ে এই চক্রের শিকার হন।

সিএইচটি টাইম ও এজাহার অনুসারে, ঋণ অনুমোদনের আশ্বাস দিয়ে গত ৮ নভেম্বর ২০২৪ বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে নিক্সন চাকমা ভিকটিমকে রাঙামাটি শহরের একটি আবাসিক হোটেলের দ্বিতীয় তলার কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে দরজা বন্ধ করে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন এবং স্থিরচিত্র ও ভিডিও ধারণ করেন। এরপর, এসব ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেল করা হয়। প্রথম ঘটনার ১৫-২০ দিন পরপর ‘জাঙ্গি’ অ্যাপের মাধ্যমে ভিডিও ও ছবি পাঠিয়ে পুনরায় শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের চাপ দেওয়া হতো। গত ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ বিকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে নিক্সনের স্ত্রী অনুরাধা চাকমা ভিকটিমকে এসএমএস পাঠিয়ে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন, পরে তা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। টাকা না দিলে আত্মীয়স্বজন এবং সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

নির্ধারিত সময়ে টাকা না দেওয়ায়, আসামিরা ফেসবুক মেসেঞ্জারসহ সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও এবং স্থিরচিত্র ছড়িয়ে দেন। এর ফলে ভিকটিম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং অবশেষে সোমবার ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ রাঙামাটি কোতয়ালী থানায় এজাহার দাখিল করেন। মামলা নম্বর ১৫ (তারিখ ২৯/১২/২০২৫), জিআর নম্বর ১৩৩। মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ৯(১) ধারা এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ এর ৮(১)/৮(২)/৮(৩) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। রাঙামাটি কোতয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ মো: জসিম উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তদন্ত চলমান এবং আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

আসামি নিক্সন চাকমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠালে তিনি “দাদা কথা বলার মতো অবস্থায় নেই” লিখে নিউজ না করার অনুরোধ করেন। অন্যদিকে, সোনালী ব্যাংকের শাখা ম্যানেজার বলেন যে নিক্সন অত্যন্ত ভালো এবং বিচক্ষণ প্রকৃতির। তিনি দুইদিনের ছুটি নিয়েছিলেন, যা সোমবার শেষ হয়েছে, এবং মঙ্গলবার পারিবারিক কারণ দেখিয়ে নতুন ছুটির দরখাস্ত দিয়েছেন। এই ঘটনা দেখায় যে অভিযুক্তরা কীভাবে তাদের অবস্থান ব্যবহার করে অপরাধ করে এবং পরে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করে।

এই ঘটনা কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ এটি পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্ষণের একটি উদাহরণ, যা সাধারণত চাপা দেওয়া হয়। যদি এই অভিযুক্তরা বাঙালি হতেন, তাহলে সম্ভবত ইউপিডিএফ সহযোগী অঙ্গসংগঠন ও জেএসএস এবং অন্যান্য গ্রুপগুলো প্রতিবাদে ফেটে পড়ত। প্রেস বিজ্ঞপ্তি, সভা-সমাবেশ এবং জাতিসংঘে নালিশ হতো। কিন্তু এখানে নীরবতা। কেন? এটি দেখায় যে ধর্ষণকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, না যে নারীদের ন্যায়বিচারের জন্য। যদি সত্যিকারের উদ্দেশ্য নারী অধিকার রক্ষা হয়, তাহলে সব ঘটনায় সমানভাবে প্রতিবাদ করা উচিত। কিন্তু এখানে দ্বিচারিতা স্পষ্ট: বাঙালি অভিযুক্ত হলে আন্দোলন, পাহাড়ি অভিযুক্ত হলে নীরবতা।

এই দ্বিচারিতা শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, সামাজিকও। পাহাড়ি সম্প্রদায়ে ভিকটিমকে জরিমানা ও শাস্তির ভয় দেখানো হয় যাতে ঘটনা প্রকাশ না পায়। এটি নারীদের আরও অসহায় করে তোলে। ফলে, অনেক ঘটনা অভিযোগ পর্যন্ত পৌঁছায় না। অন্যদিকে, বাঙালি জড়িত ঘটনায় অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হয়, যা জাতিগত সংঘর্ষ বাড়ায়। এই চক্র ভাঙতে হলে সব পক্ষকে সত্যকে স্বীকার করতে হবে। ধর্ষণ কোনো জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি ঘৃণিত অপরাধ, যা সবাই মিলে লড়াই করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এই দ্বিচারিতা বন্ধ করা দরকার। সংগঠনগুলোকে নিরপেক্ষ হয়ে সব ঘটনায় প্রতিবাদ করতে হবে। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের জন্য একটি সমান দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। যতক্ষণ না এই দ্বিচারিতা থাকবে, ততক্ষণ পাহাড়ে সত্যিকারের শান্তি আসবে না। এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে অপরাধীকে তার অপরাধের জন্য বিচার করুন, জাতি দেখে নয়। সুতরাং দ্বিচারিতা বন্ধ করুন, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করুন।

আগের পোস্টপাহাড়ে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: বন্য ভাল্লুকে আক্রমণে আহত পাহাড়িকে চিকিৎসা দিল সেনাবাহিনী।
পরের পোস্টখালেদা জিয়ার জন্য শোকে স্তব্ধ সারাদেশ: হাবিব আজম

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন