জেএসএস-এর মানবাধিকার প্রতিবেদন: তথ্যের আড়ালে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা।

0

পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে মানবাধিকার প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বয়ান, কৌশলগত অতিরঞ্জন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তির শিকার। সর্বশেষ ২০২৫ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ১ জানুয়ারি ২০২৬ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা প্রথম পাঠেই একটি মানবাধিকার দলিলের চেয়ে বেশি একটি রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বলেই প্রতীয়মান হয়। কারণ, উক্ত প্রতিবেদনে তথ্যের চেয়ে ভাষাগত উস্কানি, আইনি বাস্তবতার চেয়ে আদর্শিক আকাঙ্ক্ষা এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের পরিবর্তে একপেশে অভিযোগের আধিক্য সুস্পষ্ট।

জেএসএস প্রতিবেদনের প্রথম এবং মৌলিক বিভ্রান্তি নিহিত রয়েছে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে জেএসএস নিজেই ‘উপজাতি’ পরিচয়ে সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদেও পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীগুলোকে ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই সাংবিধানিক ও চুক্তিগত বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে জেএসএস যখন পুনরায় ‘আদিবাসী’ বয়ান চাপিয়ে দেয়, তখন তা মানবাধিকার নয়, বরং আইনি কাঠামো ভাঙার একটি রাজনৈতিক প্রয়াস হয়ে ওঠে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: আন্তর্জাতিক আইনেও উপজাতি জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো একক, বাধ্যতামূলক বা স্বয়ংক্রিয় বিধান নেই। এই প্রশ্নটি বসবাসের রাষ্ট্রীয় ঐতিহাসিক ইতিহাস, সংবিধান, জনগণের মতামত ও নির্বাচিত সরকারের এখতিয়ারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটি সীমিত মেয়াদের অন্তর্বর্তী সরকার এই ধরনের মৌলিক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনগত কিংবা নৈতিক অধিকার রাখে না।

জেএসএস দাবি করেছে যে জুলাই সনদে উপজাতি কিংবা সংখ্যালঘুদের বিষয় উপেক্ষিত। বাস্তবতা হলো: জুলাই সনদে সংখ্যালঘু সুরক্ষা, ন্যায়বিচার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার একাধিক নীতিগত দিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে সেখানে ‘আদিবাসী স্বীকৃতি’ না থাকা কোনো বৈষম্যের প্রমাণ নয়, বরং এটি সংবিধান ও চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল অবস্থান।

অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে কোনোভাবেই চলমান সংবিধানিক বিতর্ক, আদালতে বিচারাধীন বিষয় কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত একতরফাভাবে কার্যকর করতে পারে না, এই মৌলিক সত্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকার করাই জেএসএস প্রতিবেদনের কৌশলগত দুর্বলতা।

জেএসএসের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ ধারা নাকি অবাস্তবায়িত। অথচ প্রকৃত তথ্য বলছে, চুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৫টি ইতোমধ্যে পূর্ণ বাস্তবায়িত, ৩টি প্রক্রিয়াধীন এবং মাত্র ৪টি আংশিক বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। এই বাস্তবতাকে গোপন করে ‘চুক্তি অবাস্তবায়ন’ বলে প্রচার করা এক ধরনের তথ্য বিকৃতি।

এখানে আরও একটি গুরুতর প্রশ্ন উঠে আসে, চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল শান্তি ও নিরস্ত্রীকরণ। কিন্তু চুক্তির ২৮ বছর পরও পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের অবাধ চলাচল, একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য লড়াই, চাঁদাবাজি ও অপহরণ যদি অব্যাহত থাকে, তবে দায় শুধু রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপানো কতটা নৈতিক? জেএসএসের তথাকথিত অস্ত্রসমর্পণ যে কার্যত একটি ভাঁওতাবাজি ছিল, এই ধারণা পাহাড়ি ও সমতলের বহু সচেতন নাগরিকের মধ্যেই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।

২০২৫ সালে ২৬৮টি ঘটনায় ৬০৬ জন ‘জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার’, এই দাবি জেএসএস করেছে কোনো যাচাইযোগ্য উৎস, মামলা, তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা নিরপেক্ষ সংস্থার তথ্য ছাড়াই। বাস্তবতা হলো, জেএসএস নিজেই দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে চাঁদাবাজি, খুন, গুম, আধিপত্য বিস্তার ও প্রতিপক্ষ দমনের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত।

একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি মুসলমানদের ‘মৌলবাদী সেটেলার’ এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ‘সশস্ত্র জঙ্গি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টির একটি সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা।

জেএসএস প্রতিবেদনে উল্লেখিত মারমা ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগ মেডিকেল পরীক্ষায় সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। তবুও সেই অভিযোগকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তা মূলত ইউপিডিএফসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীর উসকানিতেই সংঘটিত হয়। খাগড়াছড়ির গুইমারা-রামসু এলাকায় সংঘটিত সহিংসতায় তিনজন মারমা যুবকের মৃত্যু হলেও, তাদের নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং এটি ত্রিমুখী সংঘর্ষের ফল বলেই প্রতীয়মান।

‘অস্ত্র গুঁজে দেওয়া’ কিংবা ‘নিরীহ গ্রেফতার’-এর অভিযোগ পাহাড়ে নতুন নয়, কিন্তু এর কোনো ঐতিহাসিক বা বিচারিক প্রমাণও নেই। বাস্তবে আটককৃতদের বড় একটি অংশ কেএনএফ, ইউপিডিএফ কিংবা জেএসএস সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র সন্ত্রাসী, যাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক ডাকাতি থেকে শুরু করে, চাঁদাবাজি, খুন-গুম ও অপহরণের সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

রাবার বাগান, পর্যটন কিংবা হর্টিকালচারের নামে ভূমি দখলের অভিযোগ সত্য হলেও, এর সঙ্গে সেনাবাহিনী বা বাঙালি জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করা একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার। বাস্তবে এই ভূমি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে উপজাতি নেতৃত্বের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট; হেডম্যান, কার্বারি ও জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতারা, যাদের নীরব সমর্থন ছাড়া এসব কিছুই সম্ভব নয়।

৩০ জন ম্রো শিশুকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরের অভিযোগও ভিত্তিহীন। বরং পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এনজিও ও মিশনারি কার্যক্রমের মাধ্যমে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার ঘটনা বহুলভাবে আলোচিত। এই বিষয়ে জেএসএসের নীরবতা তাদের দ্বিচারিতাই প্রমাণ করে।

রোহিঙ্গাদের ‘সশস্ত্র জঙ্গি’ আখ্যা দেওয়া মানবিক ও বাস্তব, দুই দিক থেকেই অসত্য। তারা নিরস্ত্র শরণার্থী, রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে একটি নির্দিষ্ট পরিসরে বসবাস করছে। অপহরণ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতরা মূলত পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীরই অংশ।

সবশেষে, ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের ইতিহাসকে বিকৃত করে বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা জেএসএসের সেই পুরোনো বিভ্রম, ‘কল্পিত জুম্মল্যান্ড’। বাস্তবতা হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলের তুলনায় ব্যতিক্রমী।

জেএসএসের তথাকথিত মানবাধিকার প্রতিবেদন মূলত একটি রাজনৈতিক কৌশলপত্র, যার উদ্দেশ্য রাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করা, সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করা এবং পাহাড়ে সন্ত্রাসবাদী বয়ানকে নৈতিকতা দেওয়ার চেষ্টা। মানবাধিকার কোনো একক গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। সত্যিকারের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব কেবল তখনই, যখন তথ্য, ইতিহাস ও আইনের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রাখা হয়, যা জেএসএসের প্রতিবেদনে অনুপস্থিত।

আগের পোস্টখালেদা জিয়ার জন্য শোকে স্তব্ধ সারাদেশ: হাবিব আজম
পরের পোস্টশিক্ষাই জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার প্রধান শক্তি: জেলা পরিষদের সদস্য হাবীব আজম।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন