সার্কেল চীফ, হেডম্যান ও কার্বারীদের সম্মানীভাতা মৃত শাসনবিধিকে জীবিত করে।

0

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় কর্তৃক ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জারি করা একটি প্রজ্ঞাপন (স্মারক নম্বর: ৩১.০৩৬.০৩১.০০.০০.০৯৬.২০১০.০৮) পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) জেলা প্রশাসনের আওতাধীন সার্কেল চীফ, হেডম্যান এবং কার্বারীদের জনপ্রতি মাসিক সম্মানীভাতা পুনর্নির্ধারণ করেছে। এতে সার্কেল চীফদের জন্য ২০,০০০ টাকা, হেডম্যানদের জন্য ২,০০০ টাকা এবং কার্বারীদের জন্য ১,০০০ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। এই আদেশ অর্থ বিভাগের সাথে সমন্বয় করে জারি করা হয়েছে এবং এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই ব্যয় নিজস্ব রিসোর্স সিলিংয়ের মধ্যে নির্বাহ করতে হবে, কোনো অতিরিক্ত বরাদ্দ দাবি করা যাবে না।

যাইহোক, এই সিদ্ধান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। তারা এটিকে একটি অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন, যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের একটি মৃত আইন: পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০—কে জিইয়ে রাখার চেষ্টা। এই সম্মানীভাতা দেওয়া রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং জনগণের অধিকারের লঙ্ঘন কেন? প্রতিবেদনটি আইন, ন্যায়-নীতি ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে তৈরি করা হয়েছে, যাতে শাসনবিধির বিতর্কিততা, এই পদাধিকারীদের অপব্যবহার এবং সাংবিধানিক সাংঘর্ষিকতা তুলে ধরা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০ (Chittagong Hill Tracts Manual) ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা প্রণীত একটি আইন, যা ১৯০০ সালের ১ মে থেকে কার্যকর। এটি পার্বত্যাঞ্চলকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে দেশের সংবিধান, প্রচলিত আইনকে অকার্যকর করে রেখেছে, যার ফলে একই দেশে দুটি আইনের অস্তিত্ব রয়েছে। এই বিধি তিনটি সার্কেল (চাকমা সার্কেল রাঙামাটি, বোমাং সার্কেল বান্দরবান এবং মং সার্কেল রামগড়) গঠন করে, যেখানে সার্কেল চীফরা (যাদেরকে রাজা বলা হয়, কিন্তু তারা রাজা নন) প্রধান ভূমিকা পালন করেন। হেডম্যানরা মৌজা পর্যায়ে এবং কার্বারীরা গ্রাম পর্যায়ে কাজ করেন, প্রধানত উপজাতি সম্প্রদায় থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত।

এই বিধি আদালতে বারবার বিতর্কের মুখে পড়েছে। ২০০৩ সালে রাঙ্গামাটি ফুডস প্রোডাক্টস লিমিটেডের এক মামলায় হাইকোর্ট এটিকে ‘ডেড ল’ বা অকার্যকর আইন বলে রায় দেয়, যা ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংকটে ফেলে। পরে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণ বেঞ্চ ২০১৪ এবং ২০১৬ সালে এটিকে বৈধ বলে রায় দেয়। কিন্তু ২০১৮ সালে খাগড়াছড়ির বাঙালি বাসিন্দা আব্দুল আজিজ আখন্দ এবং আব্দুল মালেকের রিভিউ পিটিশনে উচ্চ আদালত এটিকে মৃত আইন হিসেবে বাতিল করে। এরপরও আঞ্চলিক দলগুলো এটিকে বলবৎ রাখার চেষ্টা করছে। চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিষ্টার দেবাশীষ এটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকেন। গত ১১ জুলাই ২০২৪-এ শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল, কিন্তু একাধিকবার পিছিয়ে যাওয়ায় বিষয়টি এখনও বিচারাধীন।

এই বিতর্কের মূলে রয়েছে যে এই বিধি দেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, কারণ এটি মৌলিক অধিকার (যেমন সমতা এবং আইনের সমান সুরক্ষা) লঙ্ঘন করে। প্রথাগত, রীতিনীতি পদ্ধতির শাস্তি, জরিমানা, রায় ন্যায় বিচারের জন্য উপযুক্ত না। ধর্ষণের মত মারাত্মক অপরাধের বিচার এই প্রথাগত বিচারের মাধ্যমে শুকর জরিমানা দিয়ে সমাধান হয়! যা নারীর প্রতি চরম অবমাননা। পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতিদের ‘সভ্যতা থেকে দূরে’ রাখা এবং বাঙালিদের বৈষম্যের শিকার করা এর ফল। এমন একটি মৃত আইনের উপর ভিত্তি করে সম্মানীভাতা দেওয়া কেন যুক্তিযুক্ত হবে? আর শাসনবিধির কোথাও তো বলা হয়নি বর্ণিত অংকে জনপ্রতি মাসিক সম্মানীভাতা প্রদানের কথা। তাহলে এই আদেশ কেন?

সার্কেল চীফ, হেডম্যান ও কার্বারীর ভূমিকা এবং ক্ষমতা কী?

সার্কেল চীফরা জেলা প্রশাসককে পরামর্শ দেন, হেডম্যান নিয়োগে সুপারিশ করেন, খাজনা আদায় নিশ্চিত করেন এবং সামাজিক রীতি-নীতির ব্যাখ্যা দেন। হেডম্যানরা মৌজায় খাজনা আদায়, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, জুম চাষ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন। তারা বসতবাড়ির জন্য জমি অনুমোদন দিতে পারেন (সর্বোচ্চ ০.৩০ একর) এবং বিচারিক ক্ষমতা (জরিমানা, মালামাল ফেরত) প্রয়োগ করেন। কার্বারীরা গ্রাম পর্যায়ে সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি করেন, যদিও তাদের ক্ষমতা শাসনবিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই; পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯-এ তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

এই কাঠামো ১৮৯২ সাল থেকে চলে আসছে, যখন পার্বত্যাঞ্চলকে মৌজায় বিভক্ত করা হয়। বর্তমানে তিন সার্কেলে ৩৯০টি মৌজা রয়েছে। হেডম্যান নিয়োগ বংশানুক্রমিক নয়, কিন্তু প্রায়শই হয়। বিচারিক ক্ষমতায় তারা উপজাতি মামলায় রায় দিতে পারেন, ২৫ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং সার্কেল চীফ ৫০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবেন। জরিমানা আদায়ে ব্যর্থ হলে আটক রাখিতে পারিবেন। আপীল প্রক্রিয়ায় জেলা প্রশাসক বা বিভাগীয় কমিশনারের ভূমিকা রয়েছে।

বৈষম্য, হয়রানি এবং অর্থের অপব্যবহার:

পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি অনুসারে সার্কেল চীফরা চাকমা ও মারমা সম্প্রদায় থেকে, হেডম্যান ও কার্বারীরা চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা সহ অন্যান্য উপজাতি থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত। এর ফলে নিয়মের বাহিরে জমি কেনা-বেচার জন্য হেডম্যান প্রতিবেদন, স্থানীয় বাসিন্দা প্রমাণে হেডম্যান প্রতিবেদন এবং জেলা পরিষদ সদস্যতায় সার্কেল চীফের রিপোর্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাঙালিরা এতে বৈষম্যের শিকার: বৈধ জমি থাকলেও টাকা ছাড়া রিপোর্ট মেলে না, ভূমিহীনরা তো পানই না। একটি হেডম্যান রিপোর্টের জন্য ১০,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়, খাজনা সর্বনিম্ন ১,০০০ টাকা।

খাজনা আদায়ে অস্বচ্ছতা: হেডম্যানরা খাজনা থেকে অংশ রাখেন, সার্কেল চীফরাও রাখেন। অনেক টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। তারা বনাঞ্চল থেকে কাঠ পাচার, জোত পারমিট থেকে অর্থ নেন। ফলে হেডম্যানরা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন, সার্কেল চীফরা কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক। অনেক হেডম্যান এলাকায় না থেকে প্রক্সি দিয়ে চালান, যা মৌজাবাসীদের হয়রানি করে। কার্বারীরা মৃত্যু, বিবাহ, বিচারে মোটা অংক নেন।

এই সিস্টেম একটি সংবিধান বিরোধী। জেলা পরিষদ সদস্য হতে অ-উপজাতি প্রমাণে সার্কেল চীফের সনদ লাগে, যা পেতে বাঙালিরা হয়রানির শিকার হতে হয়। এমন একটি ব্যবস্থায় সম্মানীভাতা দেওয়া কেন? এটি রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় এবং বৈষম্যকে উৎসাহিত করে।

কেন সম্মানীভাতা দেওয়া অনুচিত?

প্রথমত, এই ভাতা শাসনবিধির উপর ভিত্তি করে, যা আদালতে মৃত আইন হিসেবে বাতিল। বিচারাধীন থাকলেও এটি দেশের প্রচলিত ভূমি আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ (সমতা) এবং ২৮ (বৈষম্য নিষিদ্ধ) লঙ্ঘন করে। দ্বিতীয়ত, এই পদাধিকারীরা ইতোমধ্যে খাজনা, হেডম্যান প্রতিবেদন, জরিমানা, পারমিট থেকে বিপুল অর্থ উপার্জন করেন; অতিরিক্ত ভাতা অপচয়। তৃতীয়ত, এটি বাঙালিদের হয়রানি বাড়াবে, কারণ তারা এই সিস্টেমের শিকার। চতুর্থত, প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে যে অর্থ নিজস্ব সিলিং থেকে, কিন্তু এটি জনগণের করের অর্থ; এর অপব্যবহার হলে পরিশোধকারী দায়ী।

এই আদেশ বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে, যারা এটিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন। পরিবর্তে, পার্বত্যাঞ্চলে প্রচলিত আইন কার্যকর করে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করা উচিত।

সার্কেল চীফ, হেডম্যান ও কার্বারীদের মাসিক সম্মানীভাতা দেওয়া একটি অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত, যা ঔপনিবেশিক যুগের মৃত আইনকে জিইয়ে রেখে বাঙালিদের বৈষম্য এবং হয়রানি অব্যাহত রাখবে। এটি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং সংবিধানের লঙ্ঘন। বাঙালি সম্প্রদায় এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং দাবি করছে: অতিসত্বর এই আদেশ প্রত্যাহার, শাসনবিধি ভেঙে প্রচলিত আইন কার্যকর এবং হয়রানি বন্ধ করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে সকলের জন্য সমান সুযোগের অঞ্চল করতে হলে এই প্রথা বিলুপ্ত করা অপরিহার্য।

 

আগের পোস্টপাহাড়ি মেয়েদের ছবি সয়লাব সোশ্যাল মিডিয়ায়: সামাজিকভাবে হেয়-প্রতিপন্নের শিকার।
পরের পোস্টহাড় কাঁপানো শীতে গভীর রাতে শীতার্ত মানুষের পাশে হাবীব আজম।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন