জেএসএস-এর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ: পার্বত্য চুক্তির পরও অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও খুনের অধ্যায়।

0

পার্বত্য চট্টগ্রাম, যেখানে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এবং বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এবং সশস্ত্র সংঘর্ষের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর, বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই চুক্তিতে ৭২টি ধারা এবং ৯৯টি উপধারা অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা জেএসএস-এর সশস্ত্র সদস্যদের অস্ত্র ত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার শর্তে স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু চুক্তির পরবর্তী বছরগুলোতে দেখা যায়, এই চুক্তি না শুধুমাত্র বাঙালি জনগণের মতামত উপেক্ষা করেছে, বরং তাদের অধিকারও খর্ব করেছে। চুক্তিতে রাষ্ট্রীয় সংবিধান লঙ্ঘনের মতো ধারা যুক্ত হয়েছে, যেমন এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আঞ্চলিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, পার্বত্য অঞ্চলকে উপজাতি অধ্যুষিত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, পার্বত্য মন্ত্রণালয় গঠন, আঞ্চলিক পরিষদ গঠন এবং জেলা পরিষদে উপজাতি চেয়ারম্যান নির্ধারণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা উপজাতিদের হাতে ন্যস্ত করা, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে উপজাতিদের জন্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, প্রশাসনে উপজাতি আধিপত্য, ব্যাংক ঋণে সহজ শর্ত, ভারতীয় শরণার্থী পুনর্বাসনের নামে অনুপ্রবেশের ব্যবস্থা, জেএসএস সদস্যদের সরকারি চাকরি, পুনর্বাসন এবং অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের দাবিগুলো চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

সরকার সূত্র বলছে, এই চুক্তির ৯০ শতাংশেরও বেশি বাস্তবায়ন করেছে, যা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। কিন্তু জেএসএস এর পক্ষ থেকে পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি এখনও উঠছে, যদিও জেএসএস-কে চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করা হয়নি। এটি সরকারের ব্যর্থতা এবং প্রশ্নবিদ্ধতা তুলে ধরে। চুক্তির ৪৫ দিনের মধ্যে জেএসএস-কে অস্ত্র আত্মসমর্পণ করার কথা ছিল, কিন্তু তারা চুক্তির আগে পরে ৪ ধাপে মোট ১৯৪০টি অস্ত্র জমা দিয়েছে। গোলাম মূর্তজার ‘শান্তিবাহিনী গেরিলা জীবন’ বইয়ে ১৯৭৫ সালে শান্তিবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৫ হাজার বলা হয়েছে। তাহলে ১৯৯৭ সালে এত কম অস্ত্র কেন? এটি জেএসএস-কে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। ৪৫ দিনের মধ্যে অস্ত্র না জমা দিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু উভয় পক্ষ চুক্তি মেনে চলেনি।

চুক্তির পরও জেএসএস অবৈধ অস্ত্র নিয়ে চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন-গুম, আধিপত্য বিস্তার এবং প্রতিপক্ষ হত্যা অব্যাহত রেখেছে। জেএসএস-এর স্বেচ্ছাচারিতায় একাধিক উপদল তৈরি হয়েছে, যা এখন দল-উপদলে পরিণত হয়ে সন্ত্রাসবাদ কায়েম করছে। পাহাড়ের মানুষ মনে করে, জেএসএস সন্তু গ্রুপ এর জন্য দায়ী। তারা সরকারকে কথা দিয়ে রাখেনি। চুক্তির পর অস্ত্র রাখা চুক্তি লঙ্ঘন। জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমার নেতৃত্বে ৭ শতাধিকের অধিক নিরাপত্তা বাহিনী হত্যা করা হয়েছে। চুক্তির আগে ৩০ হাজার এবং পরে মিলিয়ে মোট ৩৮ হাজার নিরস্ত্র বাঙালি হত্যা করেছে, সাথে হাজারো পাহাড়ি স্বজাতি হত্যা। চুক্তির শর্তে তারা পূর্বের গণহত্যা, দেশদ্রোহীমূলক বৈরী আচরণের অভিযোগ থেকে মুক্তি পেয়েছে। বর্তমানে অস্ত্র নিয়ে খুন-গুম, চাঁদাবাজির অভিযোগে কোনো মামলা হয়নি, প্রশাসন মামলা গ্রহণ করছে না। ফলে জেএসএস-এর অপরাধ সাম্রাজ্য বাড়ছে। ত্রিদেশীয় সীমান্ত দিয়ে ভারী অস্ত্র ঢুকছে, যা পাহাড় থেকে সমতলে ছড়িয়ে পড়ছে। আঞ্চলিক দলগুলোর অবৈধ অস্ত্র মজুদ নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জিং। নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেএসএস সন্তু গ্রুপের এক সশস্ত্র কমান্ডার জানান,
“জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফ অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে। অস্ত্রভাণ্ডারে রয়েছে একে-৪৭, একে-৫৬, এম-১৬, স্নাইপার রাইফেল, মেশিনগান, হ্যান্ড গ্রেনেড, আইইডি, রকেট লঞ্চার ও অন্যান্য ভারী অস্ত্র। জেএসএস সদস্যরা গাঢ় সবুজ বা বন সবুজ সামরিক পোশাক পরিধান করে, ইউপিডিএফ সেনাবাহিনীর মতো পোশাক ব্যবহার করে। কেএনএফ তাদের সদস্যদের বিশেষ সামরিক পোশাক সরবরাহ করে।”

ভারত ও মায়ানমারের অবাধ সীমান্ত পারের মাধ্যমে অস্ত্র পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবাহিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ মিজোরাম পুলিশ এক বড় অস্ত্র চালান আটক করে। ২৭ জুন ২০২৪ খাগড়াছড়ি সীমান্ত দিয়ে ভারী অস্ত্র বাংলাদেশে প্রবেশের ঘটনা ধরা পড়ে। এসব অস্ত্র মূলত ইউপিডিএফ ও জেএসএস-এর হাতে পৌঁছছে। র‌্যাবের মতে, ধুধুকছড়া এলাকা ভারত থেকে অস্ত্র প্রবেশের একটি মূল পথ। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি শিথিল হওয়ায় এ প্রবাহ অব্যাহত।

নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র বলছে, সময়কালের বিভিন্ন অভিযানে বিপুল অস্ত্র ও সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩: গুইমারা রিজিয়নে উদ্ধার ১টি একে-৪৭, ১টি এম-১, ১টি একে-২২, ৪টি মর্টার, ১টি পিস্তল, আইইডি সরঞ্জামাদি। ৭ মে ২০২৪: কেওক্রাডং পাহাড়ে কেএনএফ সদস্য নিহত, ৩টি একে-২২, ১টি শটগান, বিস্ফোরক সরঞ্জামাদি, ড্রোন উদ্ধার।
১৪ নভেম্বর ২০২৪: মুনলাই পাড়ায় এসএমজি, ২টি গাঁদা বন্দুক, আইইডি উপকরণ উদ্ধার। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪: রুমা উপজেলার ধোপানী ছড়ায় ২টি অটোমেটিক কারবাইন, ১টি সেমি অটোমেটিক অ্যাসল্ট রাইফেল, ৩টি এসবিবিএল, সোলার সিস্টেম, ড্রোন উদ্ধার। ২১ ডিসেম্বর ২০১৮: রাঙামাটিতে মেশিনগানসহ তিন অস্ত্র ব্যবসায়ী আটক।

এই উদ্ধার অভিযানগুলির পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, পার্বত্য অঞ্চলে অস্ত্র ভাণ্ডার বিপুল হলেও উদ্ধারকৃত অস্ত্র সামান্য। ফলে সন্ত্রাসী কার্যক্রম সীমিত করা সম্ভব হয়নি।

গত ১১ জুন ২০২২ ভারত থেকে ইউপিডিএফ-এর ৩ কোটি টাকার অস্ত্র চালান পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করায় সংঘর্ষ শুরু হয়। জেএসএস-এর কমান্ডার অর্জুন ত্রিপুরার নেতৃত্বে রাঙামাটি বাঘাইছড়ি-ভারত সীমান্তে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়। সংঘর্ষে ইউপিডিএফ-এর ২ জন নিহত ও ৬ জন আহত হয়। ১২ ও ১৮ জুলাই পুনরায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

সূত্র অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলের ১৭৮ কিলোমিটার সীমান্ত অধিকাংশই জেএসএস-এর দখলে। ইউপিডিএফ বাঘাইছড়ি সীমান্তের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ভারত থেকে অস্ত্র আনা প্রধান পথ বাঘাইছড়ি সীমান্ত। ইউপিডিএফ অস্ত্র চালানের পথ আটকাতে জেএসএস দীঘিনালা ও পানছড়ির কিছু এলাকা দখল করে।

জেএসএস ও ইউপিডিএফ থেকে দলছুট ব্যক্তিরা বলছেন, “সশস্ত্র গোষ্ঠী পাহাড়িদের অধিকারের দোহাই দিয়ে চাঁদাবাজি করে। আদায়কৃত অর্থ দিয়ে শীর্ষ নেতারা দেশ-বিদেশে বিলাসিতায় জীবনযাপন করে, সন্তানদের বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়। প্রকৃতপক্ষে, পার্বত্য অঞ্চলকে নরকায় পরিণত করা হয়েছে অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে।”

সাত রাজ্যের ভারতীয় রাজ্য, যেমন মিজোরাম, ত্রিপুরা ও অরুণাচল প্রদেশ থেকে অস্ত্র সরবরাহ হচ্ছে। মায়ানমার থেকে মিজোরামের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলে অস্ত্র প্রবাহিত হচ্ছে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া না থাকার কারণে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অবাধে চলাচল করছে।

এই তথ্যগুলো থেকে প্রতীয়মান যে, চুক্তির পরও অস্ত্রের প্রসার অব্যাহত, যা শান্তিকে ধুলিসাৎ করছে। পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে, মানুষ নিরাপত্তাহীন। চুক্তির ধারাগুলো যেমন আঞ্চলিক পরিষদ এবং ভূমি ব্যবস্থাপনা উপজাতিদের হাতে দিয়ে বাঙালিদের অধিকার খর্ব করেছে, তেমনি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ হয়েছে। পার্বত্য চুক্তি শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু অস্ত্রের ঝনঝনানি তা অসম্পূর্ণ রয়েছে। অস্ত্র আটকের তথ্য দেখায়, সন্ত্রাসবাদ এবং অস্ত্র প্রসার অব্যাহত। সকল পক্ষকে চুক্তি মেনে চলতে হবে, অন্যথায় পাহাড়ের শান্তি স্বপ্নই থেকে যাবে।

 

আগের পোস্টরাঙামাটি মেডিকেল কলেজে মনিরের নামে হল করার দাবি পিসিসিপির।
পরের পোস্টপাহাড়ের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবিচল বিলাইছড়ি সেনা জোন।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন