পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি বিশেষ অঞ্চল, যা ভূপ্রকৃতি, সংস্কৃতি, এবং জনগণের বৈচিত্র্যের জন্য আলাদা পরিচিতি বহন করে। এখানকার জনগণের উন্নয়ন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি। চুক্তির লক্ষ্য ছিল পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সংঘাত নিরসন এবং একটি টেকসই শান্তি প্রক্রিয়া তৈরি করা। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের ২৭ বছর পরও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ শাসনব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষত, চুক্তিতে স্থানীয় প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং উপজাতীয়দের জন্য বিশেষ সুবিধা ও ক্ষমতার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-এর সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা মনে করেন, চুক্তি অনুযায়ী বিশেষ শাসনব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ায় এখানকার অধিবাসীরা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে বাস করছে।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, চুক্তির বেশিরভাগ ধারা ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং চুক্তির কিছু সাংবিধানিক জটিলতার কারণে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই ব্লগে আমরা সন্তু লারমার বক্তব্য, সরকারের অবস্থান, এবং পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করব।
পার্বত্য চুক্তির পটভূমি ও উদ্দেশ্য, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার এবং জেএসএসের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল পার্বত্য চুক্তি। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল:
(১) বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা: পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় জনগণের জন্য একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ব্যবস্থা গঠন।
(২) অস্ত্রধারীদের নিরস্ত্রীকরণ: সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা।
(৩) উন্নয়ন ও সংস্কৃতি রক্ষা: পাহাড়ি জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষা করা।
চুক্তির আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠন, তিনটি জেলা পরিষদ গঠন, এবং পার্বত্য মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল।
সন্তু লারমার বক্তব্য: বিশেষ শাসনব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটিতে আয়োজিত ‘তারুণ্যের উৎসব’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে সন্তু লারমা দাবি করেন যে, চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ শাসনব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। তার বক্তব্যের প্রধান পয়েন্টগুলো হলো:
চুক্তির মূল প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পাহাড়ি জনগণের জন্য একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করার কথা থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এখনও আর্থিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে এবং তাদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি।
সন্তু লারমা মনে করেন, সরকার পাহাড়ি জনগণের সমস্যাগুলো সমাধানে আন্তরিক নয়।
তার মতে, চুক্তির অধীনে যে অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ি জনগণ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে জীবনযাপন করছে।
সরকারের দাবি: চুক্তির বেশিরভাগ ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, পার্বত্য চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৮টি ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। সরকারের মতে, চুক্তি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে তারা অভিযোগ করেছে যে, জেএসএস চুক্তির মৌলিক শর্তগুলো মানছে না, যা চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
সরকারের বক্তব্যের মূল দিকগুলো হলো:
(১) সন্ত্রাস ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার: পাহাড়ি অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা চুক্তি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা।
(২) বিশেষ শাসনব্যবস্থা ইতোমধ্যে চালু: পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, তিনটি জেলা পরিষদ, এবং পার্বত্য মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়েছে, যা বিশেষ শাসনব্যবস্থারই অংশ।
(৩) উন্নয়নের উদ্যোগ: পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যেমন ভূমি সমস্যা সমাধানে কাজ শুরু এবং পাহাড়ি জনগণের জীবনমান উন্নত করার উদ্যোগ।
বিশেষ শাসনব্যবস্থা: কতটুকু কার্যকর?
পার্বত্য চুক্তির আওতায় নেওয়া পদক্ষেপগুলো অনেকাংশে বাস্তবায়িত হলেও বিশেষ শাসনব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
বাস্তবায়িত পদক্ষেপ:
(১) আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদ: পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি জেলা পরিষদ গঠন করা হয়েছে, যেখানে উপজাতি সম্প্রদায়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
(২) সরকারি দপ্তর স্থানান্তর: অনেক সরকারি দপ্তর আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে হস্তান্তর করা হয়েছে।
(৩) সংস্কৃতি ও শিক্ষা: পাহাড়ি জনগণের ভাষা, সংস্কৃতি, এবং শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অসম্পূর্ণ বিষয়:
(১) চুক্তির অনেক ধারা এখনো কার্যকর হয়নি, যেমন ভূমি সমস্যা সমাধান, জেলা পরিষদের হাতে পুলিশ হস্তান্তর এবং পার্বত্য প্রশাসনিক কার্যক্রম আঞ্চলিক পরিষদ কর্তৃক সমন্বয়।
(২) পাহাড়ি অঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাত এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এখনও একটি বড় সমস্যা।
(৩) বিশেষ শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি: উভয় পক্ষের যুক্তি মূল্যায়ন। সন্তু লারমার বক্তব্য এবং সরকারের দাবির মধ্যে পার্থক্য থাকলেও উভয়ের যুক্তিতে কিছু যৌক্তিক দিক রয়েছে।
সন্তু লারমার যুক্তি: পার্বত্য অঞ্চলের অনেক সমস্যা এখনো সমাধান হয়নি। বিশেষ শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় পাহাড়ি জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে।
সরকারের যুক্তি: চুক্তির বেশিরভাগ ধারা ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র এবং সন্ত্রাসীদের তৎপরতা চুক্তি বাস্তবায়নের প্রধান বাধা। সরকার পাহাড়ি অঞ্চলে উন্নয়নের জন্য অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে।
চুক্তি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেমন:
( ১)অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার: পাহাড়ি অঞ্চলে একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ সৃষ্টি এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম চুক্তি বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।
(২) সাংবিধানিক জটিলতা: চুক্তির কিছু ধারা-উপধারা বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তা বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রের আধিপত্য খর্ব হবে এবং বাঙালিরা উচ্ছেদের শিকার হবে। যা বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি করছে।
(৩) বিশ্বাসের অভাব: সরকার এবং জেএসএসের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব চুক্তি বাস্তবায়নে বড় বাধা।
সমাধানের উপায়: পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য উভয় পক্ষের আন্তরিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
(১) বিশ্বাস পুনঃস্থাপন: সরকার এবং জেএসএসের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করতে হবে।
(২) অবৈধ অস্ত্র বন্ধ: পাহাড়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
(৩) জনগণের অংশগ্রহণ: পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের মতামত এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
(৪) সাংবিধানিক সমন্বয়: চুক্তির ধারাগুলোকে সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রয়োজন এবং কিছু সংশোধন প্রয়োজন।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ শাসনব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া নিয়ে সন্তু লারমার বক্তব্য আংশিক যৌক্তিক হলেও, সরকারের দাবি এবং চুক্তি বাস্তবায়নে নেওয়া পদক্ষেপগুলোকেও উপেক্ষা করা যায় না। উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা এবং আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষের যৌথ উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: অজয় দাস, রাঙামাটি