অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে জেএসএস এর ৭ দফা দাবি!

0

হিলনিউজবিডি প্রতিবেদক:

পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক, জাতিগত ও প্রশাসনিক জটিলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (PCJSS and BD Gov Accord) ছিল একটি বড় পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার আশা জাগানো হয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এই চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এবং সরকারের মধ্যে।

সম্প্রতি জেএসএস সন্তু লারমা গ্রুপ “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন” ব্যানারে ৭ দফা দাবি উত্থাপন করেছে এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে গণসংযোগ ও প্রচার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। লিফলেটের মাধ্যমে তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে যে, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে সরকারের কর্মসূচির অগ্রাধিকারে রাখতে হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই দাবিগুলোর যৌক্তিকতা কতটুকু? কেন হঠাৎ জেএসএস এতটা সক্রিয় হয়ে উঠেছে? তাদের উদ্দেশ্য কি প্রকৃতপক্ষে চুক্তি বাস্তবায়ন, নাকি কোনো গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা?

জেএসএস তাদের দাবি-দাওয়ার মাধ্যমে এটি বোঝাতে চাচ্ছে যে, সরকার পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে নিষ্ক্রিয় রয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, পার্বত্য চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৮টি ইতোমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে। বাকি কয়েকটি ধারা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন। তাহলে প্রশ্ন আসে, জেএসএস আসলে কী চায়?

প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:

১. চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন: কিন্তু বাস্তবে সরকার এই প্রক্রিয়াকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করছে। প্রতিটি ধারা বাস্তবায়নে সময় ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন।

২. সামরিক কর্তৃত্ব ও পরোক্ষ শাসনের অবসান: এটি দীর্ঘদিন ধরেই জেএসএস-এর একটি মূল দাবি। অথচ বাস্তবতা হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা মোতায়েন শুধুমাত্র নিরাপত্তার স্বার্থে এবং এটি পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

৩. আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদকে ক্ষমতায়ন: বর্তমানে আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে জেএসএস এখানে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।

৪. ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি ও শরণার্থী পুনর্বাসন: পার্বত্য ভূমি কমিশন ইতোমধ্যে সক্রিয়, এবং সরকারের পক্ষ থেকে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যক্রম চলমান। কিন্তু জেএসএস এই কমিশনের মাধ্যমে নিজেদের সুবিধামতো ভূমি দখল করতে চায়।

৫. অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব: জেএসএস দাবি করছে যে, পার্বত্য জনগোষ্ঠী মূল অর্থনীতির বাইরে রয়েছে। অথচ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, যেখানে সকল সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ রয়েছে।

৬. স্থানীয় সরকারে সংরক্ষিত আসন: এটি একটি রাজনৈতিক দাবি, যার মাধ্যমে তারা প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করতে চায়।

৭. সমতলের উপজাতীয়দের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন: এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাইরের দাবি, যা মূলত উপজাতীয় সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ সুবিধা আদায়ের কৌশল মাত্র।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে দাবি তোলা কতটা যৌক্তিক?

জেএসএস একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে এই দাবিগুলো পেশ করেছে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আসে— এই সরকার কোনো নির্বাচিত সরকার নয়। তারা কেবলমাত্র একটি স্বল্পমেয়াদী শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করছে, যা মূলত দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নতুন নির্বাচনের পথ সুগম করা পর্যন্ত সীমিত। তাহলে তাদের কাছে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দাবি জানানো আসলে কতটা বাস্তবসম্মত?

এটি স্পষ্ট যে, জেএসএস বর্তমান সরকারের অস্থায়ী অবস্থানকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে কিছু অসাংবিধানিক ও বিতর্কিত ধারা বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে।

অস্ত্র সমর্পণ: চুক্তির মূল শর্ত, যা উপেক্ষিত! পার্বত্য চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল অবৈধ অস্ত্র জমা দেওয়া। চুক্তির ৪৫ দিনের মধ্যে জেএসএস-এর সকল অস্ত্র সরকারের কাছে হস্তান্তরের কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা এখনো অস্ত্র সমর্পণ করেনি।

সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলা, চাঁদাবাজি এবং গুমের ঘটনায় জেএসএস-এর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। তাহলে এই অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলমান রেখে কীভাবে তারা শান্তির দাবিদার হয়?

সরকারের অন্যতম শর্ত ছিল, সকল অস্ত্র জমা দিতে হবে, তারপর চুক্তির অন্যান্য বিষয় বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু জেএসএস একদিকে অস্ত্রধারী গোষ্ঠী ধরে রেখেছে, অন্যদিকে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে চুক্তির কিছু বিতর্কিত দফা বাস্তবায়নের জন্য।

কেন চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে জেএসএস-এর এত তৎপরতা?
জেএসএস হঠাৎ করেই কেন এত সক্রিয় হলো? কয়েকটি কারণ হতে পারে—

১. বর্তমান সরকারের দুর্বল অবস্থা কাজে লাগানোর চেষ্টা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দীর্ঘমেয়াদী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, তাই জেএসএস চুক্তির বিতর্কিত অংশগুলো এখনই বাস্তবায়নের চাপ দিচ্ছে।

২. আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা: নতুন সরকার গঠনের আগে কিছু চুক্তি বাস্তবায়ন করিয়ে ভবিষ্যতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা।

৩. অবৈধ অস্ত্র রাখা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানোর পক্ষে যুক্তি তৈরি: যদি সরকার চুক্তির অসম্পূর্ণ অংশ বাস্তবায়ন করে, তাহলে জেএসএস তাদের অস্ত্র ধরে রাখার যুক্তি তুলে ধরতে পারবে।

সচেতন নাগরিক ও বিশ্লেষকেরা মনে করেন, চুক্তির বাস্তবায়ন হওয়া উচিত, তবে নিরপেক্ষভাবে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে বিতর্ক থাকলেও, এটি বাস্তবায়িত হওয়া উচিত— তবে সকল পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, কোনো একপক্ষকে বিশেষ সুবিধা না দিয়ে।

সত্যিকার অর্থে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই দরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা। যখন জেএসএস পুরোপুরি অস্ত্রহীন হবে, তখনই তারা চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি করতে পারে।

বর্তমানে জেএসএস চুক্তির কিছু অংশ বাস্তবায়নের জন্য চাপ দিচ্ছে, কিন্তু অস্ত্র জমা দেওয়া ও সন্ত্রাস বন্ধের বিষয়ে নীরব রয়েছে। এটি স্পষ্ট যে, তাদের উদ্দেশ্য শুধু চুক্তি বাস্তবায়ন নয়, বরং নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য নিশ্চিত করা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনতে হলে সকল পক্ষকে সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে, বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর চাপে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা যাবে না।

শান্তি আসবে তখনই, যখন অস্ত্রহীন পাহাড়বাসী সত্যিকার উন্নয়নের অংশীদার হবে— কোনো গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শিকার হবে না।

 

আগের পোস্টরাঙামাটির সাজেক সীমান্তে ভারতীয় চকলেট জব্দ।
পরের পোস্টপার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ কাঠ চোরাচালানের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানে বিজিবি।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন