২২ মার্চ গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের কাছ থেকে প্রাপ্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে যেগুলো এখনই বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো অনতিবিলম্বে কার্যকর করার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
শনিবার গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন হস্তান্তরকালে প্রধান উপদেষ্টা এই মন্তব্য করেন।
কমিশন প্রধান কামাল আহমেদসহ অন্যান্য সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার হাতে তাদের প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন।
বিতর্কিত ‘আদিবাসী’ শব্দের অন্তর্ভুক্তি:
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনার ১৫৭ পৃষ্ঠার ২১.১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য সমসুযোগ সৃষ্টি সম্পর্কিত সুপারিশ”।
গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে:
১. গণমাধ্যম নীতিমালায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভাষা, সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ;
২. গণমাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম সম্প্রচার সময়সীমা নির্ধারণ;
৩. আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে সংবাদ ও অনুষ্ঠান আদিবাসী ভাষায় প্রচারের অগ্রাধিকার;
৪. আদিবাসীদের নিজস্ব গণমাধ্যম গড়ে তুলতে নিবন্ধন সহজীকরণ ও সহায়তা প্রদান;
৫. মূলধারার গণমাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর যথাযথ উপস্থাপনের জন্য নির্দেশিকা প্রস্তুত;
৬. সাংবাদিকতা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে ‘আদিবাসী বিষয়’ (Indigenous Studies) অন্তর্ভুক্ত করা;
৭. আদিবাসী সাংবাদিকদের জন্য ফেলোশিপ ও নিয়োগে অগ্রাধিকার প্রদান।
ILO কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯: উপজাতি ও আদিবাসী সংজ্ঞা
এই কনভেনশনে উপজাতি ও আদিবাসীদের জন্য আলাদা সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে:
(১)(এ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উপজাতি:
স্বাধীন দেশে বসবাসরত জনগোষ্ঠী, যাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা দেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠী থেকে ভিন্ন। যাদের নিজস্ব রীতিনীতি, ঐতিহ্য বা বিশেষ আইন দ্বারা পরিচালিত হয়। তারা মূল জনগোষ্ঠীর তুলনায় আলাদা সত্তা হিসেবে বিদ্যমান।
(১)(বি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদিবাসী:
যারা উপনিবেশ স্থাপনের আগে বা রাষ্ট্রীয় সীমা নির্ধারণের আগে কোনো অঞ্চলে বসবাস করত। যারা ঐ অঞ্চলের আদি জনগোষ্ঠী এবং তাদের নিজস্ব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা বজায় রেখেছে।
জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী:
(১)(এ) অনুচ্ছেদ অনুসারে, বাংলাদেশে বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও অন্যান্য জনগোষ্ঠী “উপজাতি” হিসাবে চিহ্নিত।
(১)(বি) অনুচ্ছেদে উল্লেখিত আদিবাসী সংজ্ঞার শর্ত— “উপনিবেশ স্থাপনের পূর্বে দেশটির অন্তর্গত একটি ভৌগলিক অঞ্চল থেকে বংশোদ্ভূত”— এ অনুযায়ী বাংলাদেশে কোনো জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে গণ্য হতে পারে না।
নৃবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশে উপজাতিদের বসবাসের ইতিহাস ৩০০ বছরের বেশি নয়। তাই তারা “আদিমতম জনগোষ্ঠী” হওয়ার দাবি করতে পারে না।
বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ শব্দের সাংবিধানিক বিতর্ক:
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে, বাংলাদেশে বাঙালি ব্যতীত অন্যান্য জাতিসত্তা উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৯৭ সালের জেএসএস এ সরকার মধ্যকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মাধ্যমেও উপজাতিদের এই পরিচয় সংরক্ষিত রয়েছে। অথচ কিছু এনজিও, বিদেশি সংস্থা এবং কূটনীতিক গোষ্ঠী বিতর্কিত ‘আদিবাসী’ শব্দটি সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য উপজাতি সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে উসকানি দিচ্ছে।
সরকার একাধিকবার প্রজ্ঞাপন জারি করে সংবিধান সম্মত ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহারের নির্দেশনা দেয় এবং ‘আদিবাসী’ শব্দটি প্রচার ও ব্যবহার থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেয়। টিভি টকশোতে শব্দটি ব্যবহার বন্ধে গণমাধ্যম কর্মী, সাংবাদিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিধিনিষেধ আরোপ করেন। কিন্তু এনজিও পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিদেশি অনুদান প্রাপ্ত উপদেষ্টারা এই প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার বাড়ানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
২০০৭ সালে জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র ও বাংলাদেশের অবস্থান:
২০০৭ সালে জাতিসংঘ ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সংক্রান্ত’ (United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples – UNDRIP) একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে।
এই ঘোষণাপত্রটি ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। যার পক্ষে ভোট দেয় ১৪৪টি দেশ, বিপক্ষে ভোট দেয় ৪টি দেশ (অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) এবং ১১টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
ভোটদানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে ছিল বাংলাদেশ, আজারবাইজান, ভুটান, বুরুন্ডি, কলম্বিয়া, জর্জিয়া, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, রাশিয়ান ফেডারেশন, সামোয়া ও ইউক্রেন। অর্থাৎ, বাংলাদেশ এই ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেনি, যা স্পষ্টতই বোঝায় যে বাংলাদেশ সরকার ‘আদিবাসী’ শব্দকে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।
জাতিসংঘের এই ঘোষণাপত্রে ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর জন্য ৪৫টি বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
- ১.আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় সেনাবাহিনীর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা;
- ২.আদিবাসীদের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার’ (Self-determination);
- ৩.রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও জাতীয়তাবাদ লাভের অধিকার;
এই ঘোষণাপত্র গৃহীত হওয়ার পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আন্দোলন জোরদার করে। চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা তাদের পূর্বেকার অবস্থান থেকে সরে এসে এখন ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র:
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে কয়েকটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সক্রিয়। এসব গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ‘আদিবাসী’ পরিচিতি দাবি করে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে।
যদি বাংলাদেশ সরকার ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি প্রদান করে, তবে এসব গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী স্বায়ত্তশাসন, পৃথক সরকার এবং জাতীয়তাবাদ দাবি করতে পারবে। এটি পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনার অংশ।
এই বিতর্কিত আদিবাসী শব্দ সংযোজন যারা করেছেন তারা হলেন, প্রধান কমিশনার কামাল আহমেদ ও কমিশনের অন্যান্য সদস্যরা হলেন— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতিআরা নাসরীন, দ্য ফিন্যানসিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের প্রতিনিধি শামসুল হক জাহিদ, অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন ওনার্স (অ্যাটকো) প্রতিনিধি মাছরাঙা টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী, নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সচিব আখতার হোসেন খান, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের ট্রাস্টি ফাহিম আহমেদ, মিডিয়া সাপোর্ট নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক সাংবাদিক জিমি আমির, ডেইলি স্টারের বগুড়া জেলা প্রতিনিধি মোস্তফা সবুজ, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ডেপুটি এডিটর টিটু দত্ত গুপ্ত এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল মামুন।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের ষড়যন্ত্রমূলক সুপারিশ:
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার বৃদ্ধি ও প্রচারের যে সুপারিশ করা হয়েছে, তা স্পষ্টতই এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। যেসব এনজিও এবং কূটনৈতিক সংস্থা এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
পদক্ষেপ গুলো হলো—
১. গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের এই বিতর্কিত সুপারিশ বাতিল করতে হবে, এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে;
২. গণমাধ্যমে ‘আদিবাসী’ শব্দের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে;
৩. পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদতদানকারী এনজিওগুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে;
৪. সংবিধানের ভিত্তিতে ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহার নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের জন্য নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে হবে।
‘আদিবাসী’ শব্দটি বাংলাদেশে বিতর্কিত, কারণ এটি সংবিধান স্বীকৃত নয়। কিছু এনজিও ও বিদেশি সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ পরিচিতি দিতে প্ররোচিত করছে, যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে হবে এবং গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাতিল করতে হবে।