||নাহিদা জেসমিন, সম্পাদকীয়||

জেএসএস সন্তুর কমন একটা অভিযোগ সবসময় থাকে, তা হলো- সরকার তাদের সঙ্গে সম্পাদিত ‘পার্বত্য চুক্তি’ বিন্দুমাত্রও বাস্তবায়ন করছে না!

চুক্তির পূর্বের উপজাতিদের জীবনমানের বেহাল অবস্থা, এবং চুক্তির পরের উপজাতিদের জীবনমানের উন্নয়নের ছোঁয়াই বলে দেয়, জেএসএস সন্তুর কমন অভিযোগটি মিথ্যা ও বানোয়াট, এবং উদ্দেশ্যেপ্রণোদীত। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত চুক্তি বাস্তবায়নে জেএসএস সরকারকে বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করেনি। এমনকি বারবার দেখা গেছে, চুক্তি লঙ্ঘন করে অবৈধ অস্ত্র নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন করার জন্য একাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় হতে। চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন-গুম ও রাস্ট্র বিরোধী তৎপরতা জেএসএস সহ সন্ত্রাসী সংগঠন গুলো অব্যাহত রেখে। কিন্তু সরকার চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ২৩৯ টি সেনাক্যাম্প ব্যারাকে ফেরত নিয়েছে। বাকী অবশিষ্ট ৪ টি সেনা বিগ্রেড পার্বত্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পাহাড়ে চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার অংশ হিসেবে রয়েছে৷

একটি প্রশ্ন বিভিন্ন মহল থেকে সবসময় শুনতে পাই- সেনারা পাহাড়ে কেন?? সেনারা পাহাড়ে কেন তার একটি উদাহরণ বলি- বাংলাদেশের অন্যান্য জেলায় যেমন: ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লা, রংপুর, খুলনা, যশোর, সিলেট, নোয়াখালী ও কক্সবাজার ইত্যাদি জেলায় যদি সেনাবাহিনী থাকতে পারে, তাহলে সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রাম অথাৎ (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) থাকতে পারবে না কেন?? এছাড়াও এ অঞ্চল বিচ্ছিন্নবাদ মাথাচাড়া দেওয়াই দেশের অখণ্ডতা রক্ষারস্বার্থে সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে থাকা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়।

সরকার পার্বত্য চুক্তির ৭২ টি ধারার মধ্যে ৪৮ টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করেছেন, ১২ টি ধারা আংশিক বাস্তবায়ন করেছেন আর বাকী অবশিষ্ট ১২ টি ধারা বাস্তবায়ন প্রতিক্রিয়াধীন। এটি বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজন পাহাড়ের অবৈধ অস্ত্র সম্পূর্ণরুপে পরিহার করা। কিন্তু সেটি তো জেএসএস সহ তার সমমনা দলগুলো করছে না। তাহলে চুক্তির অবশিষ্ট ধারার অংশ বাস্তবায়ন হবে কীভাবে?

চুক্তির বাস্তবায়িত ধারাগুলোর মাধ্যমে যে, সুযোগ-সুবিধা গুলো পেয়ে আজ উপজাতিরা চালকের আসনে তার নিম্নরূপ-

১. সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন করেছে বিধায়ী সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ করে (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ভোগ করে আসছেন। যার প্রেক্ষিতে এ অঞ্চল সম্পূর্ণ উপজাতি শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে।

২. তিন পার্বত্য জেলার তিনটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উপজাতি সম্প্রদায় হতে৷ যার ফলে এখানকার চাকরি-বাকরি ও জীবনমান উন্নয়ন করণের সবকিছু উপজাতিদের হাসে ন্যাস্ত হয়েছে।

৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান উপজাতি হতে। এর ফলে এখানকার উন্নয়নের চাবিকাঠি উপজাতিদের হাতে।

৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী উপজাতি। এর ফলে এখানকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা উপজাতিদের হাতের মুঠোয়।

৫. তিন পার্বত্য জেলার সংরক্ষিত নারী এমপি সহ মোট ৪ জন এমপি উপজাতি হতে। এর ফলে এ অঞ্চলের বসবাসরত উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি সৃষ্টি হয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।

৬. পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর তকমা নিয়ে সকল সুযোগ-সুবিধা, এবং সরকারি চাকরিতে উপজাতি কোটা প্রথা সৃষ্টির ফলে এ অঞ্চলে ৯৫% নিয়োগে উপজাতিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

৭. ধর্মীও বরাদ্দ পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের জন্য এদেশের অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর চেয়ে অধিকহারে বেশি।

৮. জেলা পরিষদগুলোর হাতে ন্যাস্ত করা হয়েছে সরকারি অনেকগুলো দপ্তর ও প্রতিষ্ঠান। এবং জেলা পরিষদের একতৃতীয়াংশ সদস্য উপজাতি জনগোষ্ঠী হতে তা নিশ্চিত করা হয়েছে।

আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে না দিলে চুক্তির এই সুফল গুলো সন্তু লারমা ও তার জেএসএস খুব সহজেই স্বীকার করতে চায়না!

রাস্ট্রীয় অধিককাংশ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার পাশাপাশি উপজাতি কোটায় আজকে তারা অধিক উন্নত জাতিতে পরিণত হয়েছে। তাদের অতীত ইতিহাস মোটেও উজ্জ্বল নয়। তারা ছিল একটি যাযাবর জাতি। কোনো দেশে তাদের আশ্রয় দেয়নি। প্রতিবেশি রাস্ট্র বার্মা ও ইন্ডিয়া হতে যুদ্ধে বিতাড়িত হয়ে তারা বাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৭৩০ সালের পরবর্তী সময় আশ্রয় গ্রহণ করেন৷

বাংলাদেশ সরকার তাদের এদেশে নাগরিকত্ব দিয়েছে, অধিকার দিয়েছে ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য সর্বদিক দিয়ে সহযোগিতা দিয়ে আসছেন, এবং সরকারী চাকরিতে তারা ৯৫% অগ্রাধিকার পাচ্ছেন।
বেশ করে পার্বত্য অঞ্চলে ৯৫% সরকারি অর্থ বরাদ্দ তারাই পেয়ে থাকে। বিভিন্ন দপ্তরে কোটায় সুযোগ পেয়ে আজকে সুবিধাজনক অবস্থানে।

বাংলাদেশ সরকার ও বাঙ্গালীরা অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্বার প্রতি অতি সহনশীল৷ যার কারণে অভিবাসী ও ভিনদেশী হওয়ার স্বত্তেও এদেশে তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ হয়েছে। তারা যদি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাহলে তারা অকৃতজ্ঞতার পরিচয়বহন করবে। এসমস্ত অকৃতজ্ঞ আচরণের প্রেক্ষিতে প্রতিবেশী রাস্ট্র বার্মা ও ইন্ডিয়াতে তাদের নাজুক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে, এবং হচ্ছে।
তারা বিভিন্ন সময় ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে বলেন- “সরকার যদি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না করে এক্ষেত্রে তারা অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য হবেন!” বাস্তবিক অর্থে এটি তাদের অতি বাড়াবাড়ি, এবং দুঃসাহস দেখানোর দৃষ্টান্ত। যা অকৃতজ্ঞার পরিচয়ও বটে।

১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এবং মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে এই দেশ৷ যখন দেশের মানচিত্রে আঘাত আসবে তখন বাংলাদেশ কাউকে ছাড় দিবে না। বাংলাদেশ সরকারের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে দেশের মাটির দ্বিখণ্ডিত করার দুঃসাহস দেখানোর পরিণতি কোনভাবেই শুভকর হবে না। সুতরাং সাধু সাবধান।

By admin

মতামত

x