আমি মিতালী চাকমা। আজ আমি শেয়ার করব আমার জীবনের অতীতের সেই সুখময় স্মৃতিগুলো, যা এখন শুধু অতীতের ছায়ায় আবদ্ধ। এই স্মৃতিগুলো আমার হৃদয়ে জড়িয়ে আছে, যেন এক অমলিন ফুলের সুবাস, যা সময়ের সাথে মিলিয়ে যায়নি, বরং আরও গভীর হয়েছে। কিন্তু এই স্মৃতির সাথে জড়িয়ে আছে কিছু বেদনা, কিছু অসম্পূর্ণতা, যা আমার জীবনকে এক অনন্য আকার দিয়েছে। আমি জীবনের এই গল্পটি বলব পাঁচটি পর্বে, যেন প্রতিটি পর্ব আমার জীবনের এক-একটি অধ্যায়। এই গল্পে থাকবে প্রেমের উত্থান, সংঘর্ষ, সমাজের বাধা এবং শেষে এক অসহায়ত্বের অনুভূতি। তবে এই সবকিছুর মধ্যেও আমি খুঁজে পাই একটি শিক্ষা: ভালোবাসা কখনো পাপ নয়, এটি হৃদয়ের স্বাধীনতা।
প্রথম পর্ব:
আমার বাড়ি রাঙ্গামাটি জেলা সদরের দেবাশীষ নগরে। মিতালী চাকমা আমার ছদ্মনাম। নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজের প্রকৃত নাম গোপন রাখতে হয়েছে। আমার বাবা একজন সরকারি চাকরিজীবী, মা গৃহিণী। আমরা তিন ভাই-বোনের মধ্যে আমি সবার বড়। আমার চেহারা নায়িকা মার্কা না হলেও, অধিকাংশ ছেলেরা আমার দিকে সবসময় তাকিয়ে থাকত। তবে জানি না, সেটা কেন। হয়তো আমার চোখের গভীরতা বা হাসির মধুরতা তাদের আকর্ষণ করত, অথবা পাহাড়ি মেয়েদের স্বাভাবিক সৌন্দর্যের প্রতি তাদের কৌতূহল। যাই হোক, এই দৃষ্টি আমাকে কখনো অস্বস্তিকর লাগেনি, বরং এক ধরনের আত্মবিশ্বাস দিত।
নানুর বাড়ি নানিয়ারচর উপজেলায় হওয়ার সুবাদে আমার বেড়ে ওঠা নানিয়ারচরে। আমি প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা নানিয়ারচর থেকে করেছি। স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা চলাকালীন আমার সঙ্গে সম্পর্ক হয় মোঃ রিপন নামের এক বাঙালি ছেলের। রিপনের নানিয়ারচর বাজারে দোকান ছিল। মেয়েদের প্রয়োজনীয় প্রায় সকল জিনিসই তার দোকানে পাওয়া যেত। তাই কেনাকাটার জন্য মূলত তার দোকানে নিয়মিত আসা-যাওয়া হতো। সেই সূত্র ধরে তার সাথে আমার পরিচয়। আরো একটি বিষয় হচ্ছে, আমাদের পাহাড়ি সব মেয়েরাই তার দোকানে যেত। তাই আমরা তার দোকানে সবসময় নির্ভয়ে যেতাম। দোকানদার রিপন বয়সে আমার থেকে ১০ বছরের বড় হবে। চেহারা অতুলনীয় না হলেও তার মধ্যে আলাদা মায়া আছে। ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি লম্বা এই ছেলেকে জীবনে এতটা ভালোবেসে ফেলবো, তা কল্পনার জগতে ছিল না। তার চোখের মধ্যে ছিল এক ধরনের গভীরতা, যা দেখলে মনে হতো সে বিশ্বের সবকিছু বুঝে ফেলেছে, কিন্তু নিজেকে সরল রাখতে চায়। তার হাসিতে ছিল একটা নির্মলতা, যা পাহাড়ের ঝর্ণার মতো সতেজ।
যাক, আসল কথায় আসি। প্রথম প্রথম রিপনের দোকানে যেতাম কেনাকাটার প্রয়োজন মাফিক। তার সাথে কেনাকাটার বাইরে কথা হতো না। এক কথায়, একজন বিক্রেতা আর ক্রেতার মধ্যে যা হয়, আমাদের মধ্যেও তাই ছিল। আমার বান্ধবীরা রিপনের সাথে ঠাট্টা-মশকরা করত আর ফ্রিতে জিনিসপত্র নেওয়ার ধান্দায় তাকে বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করার চেষ্টা করত। আমি আবার ফ্রি খাওয়ার ধান্দায় নেই। যার কারণে তেমন কথা না বলে বান্ধবীদের তামাশা দেখতাম। নানিয়ারচর চাকমা অধ্যুষিত এলাকা, যার প্রভাবে এখানে চাকমাদের আধিপত্য থাকাটা স্বাভাবিক। বাঙালি দোকানগুলোতে পাহাড়ি মেয়েরা বেশি আসা-যাওয়া করলে পিসিপি’র ছেলেরা যথেষ্ট সন্দেহের চোখে দেখত। এর অন্যতম কারণ ছিল নানিয়ারচরের এক বাঙালি দোকানদারের সঙ্গে রিতা চাকমা নামের এক চাকমা মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেসময় পাহাড়ি মেয়ে সেটেলার বাঙালির প্রেমের ঘটনার রেশ ধরে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তৈরি হয়েছিল। এছাড়াও নানিয়ারচরে সবসময় পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগে থাকত। এই নিয়ে সবসময় উত্তেজনা বিরাজমান। তাই বাজারে পিসিপি’র ছেলেরা চোখে চোখে রাখত পাহাড়ি মেয়েদের। কোনো পাহাড়ি মেয়ে বাঙালি ছেলের সঙ্গে কথা বা সম্পর্ক করেছে, এই খবর যদি পিসিপি’র কানে পৌঁছাত, তাহলে সে মেয়ে ও তার পরিবারের উপর স্টিমরোলার চালানো হতো। এই বিষয়গুলো নানিয়ারচরের মানুষ যারা, তারা অবশ্যই কম-বেশি জানার কথা। এই পরিবেশে বেড়ে ওঠা আমার জীবনকে সতর্কতার মধ্যে রেখেছিল, কিন্তু ভাগ্যের লিখন কে খণ্ডাতে পারে?
রিপনকে নিয়ে আমার মনের প্রথম জল্পনা-কল্পনা শুরু হয় আমাদের কঠিন চীবরদান উৎসবের সময়। সেই উৎসবের আগের দিনগুলোতে পাহাড়ের গ্রামগুলো সাজিয়ে তোলা হয় ফুল, পাতা আর রঙিন আলোয়। চীবরদান করার জন্য নারীরা সুতা বুনে আর মানুষের মুখে থাকে আনন্দের হাসি। তখন কসমেটিক্স ও বিভিন্ন সামগ্রী কেনাকাটা করতে আমি তার দোকানে যাই। আমার সঙ্গে হেমা নামে আমার এক বান্ধবী ও তার মা ছিল। হেমা ও তার মা কিছু একটা কিনতে অন্য একটা দোকানে যায়। তখন দোকানে আমি আর রিপন ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। সময়টা সকাল আনুমানিক ১০টা হবে। রিপনের দোকানের মালামাল ছিল দু’ভাবে বিভক্ত। অতিরিক্ত মালামাল দোকানের পেছনের অংশে ছিল। সামনের রুমের সঙ্গে পেছনের রুমের যাতায়াত পথ ছিল। তাই কোনো সংকোচ না করে আমরা সবসময় দোকানের পেছনের অংশে যেতাম জিনিসপত্র দেখার জন্য। সেইদিন আমি দোকানের পেছনে গিয়ে পছন্দগুলো দেখছিলাম। এমন সময় রিপন গিয়ে আমার পেছনে ঠেকেছে! পেছনের রুমে মানুষ সচরাচর প্রয়োজন ছাড়া যায় না, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রিপন আমি বুঝে ওঠার আগেই আমার সঙ্গে ঘেঁষে যায়। এমন একটা মুহূর্ত বা পরিবেশ যেখান থেকে তাকে পাশ কাটিয়ে বের হওয়ার আমার কাছে সুযোগ ছিল না। মনে হচ্ছে ঘেঁষাঘেঁষির মধ্যে আমি আর সেই এক দৃষ্টিতে ৩০ সেকেন্ডের মতো ছিলাম, এবং প্রায় ২ মিনিট ছিলাম ঘেঁষাঘেঁষির মধ্যে। অবশ্যই সেই আমাকে একপ্রকার বাধ্য করেছে। এছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। সেদিন আমি এতটা বিব্রত হয়েছিলাম এবং এতটা হতবাক হয়েছিলাম, যা ভাবনার জগতে ছিল না। কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে দ্রুত দোকান থেকে বাসায় ফিরে আসি। এই বিষয়টি নিয়ে আমি বেশ কয়েকদিন চিন্তিত ছিলাম। একপ্রকার খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। সেদিনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি নিয়ে প্রচণ্ড ঘৃণা ও জেদ হয় রিপনের প্রতি। একবার ইচ্ছে করেছিল ঘটনাটি সবাইকে জানিয়ে দিব। কিন্তু এসব কিছু জানিয়ে দিলে মেয়েদের ইজ্জত থাকে না। যেহেতু আমি পাহাড়ি মেয়ে আর সেই বাঙালি ছেলে, বিষয়টি জানালে তার অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। মেয়ে হিসেবে আমার জন্যও কলঙ্কর হবে। তাই নীরবে ক্ষোভ ও ঘৃণা চাপা দিয়েছিলাম। এরপর হতে রিপনের দোকানে আসা-যাওয়া বন্ধ করে দিই। আমার সব বান্ধবীরা তার দোকানে যেত। এভাবেই মাস তিনেক কেটে যায়। একদিন রিপন আমার বান্ধবী হেমাকে বললো আমাকে দোকানে নিয়ে আসতে, আমি কেন তার দোকানে আসি না ইত্যাদি প্রশ্ন? হেমা এসে আমাকে বলার পরও যাইনি। কিন্তু রিপনের উপর প্রচণ্ড ঘৃণা থাকলেও কেন জানি প্রায়ই তাকে মনে পড়ে। অবসর সময় সেদিনের সেই মুহূর্তগুলোই চোখে ভাসে। এভাবে আরো কিছুদিন চলে গেল। আমার মনের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব শুরু হয় ঘৃণা আর অদ্ভুত একটা টানের মধ্যে। পাহাড়ের সকালের কুয়াশার মতো এই অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখত, আর আমি বুঝতে পারতাম না এর অর্থ কী।
দ্বিতীয় পর্ব:
নানিয়ারচর টিএনটি বাজার হচ্ছে পাহাড়ি অধ্যুষিত গ্রামের একটি ছোট বাজার। এখানে কোনো বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাঙালিরা আসে না। রিপন কেন জানি সেদিন এসেছে। আমি ও আমার মামা এবং আমার মামার বন্ধু বিভাস চাকমা (নানিয়ারচর কলেজ পিসিপি’র সভাপতি) সহ মোবাইলে রিচার্জ কার্ড নেওয়ার জন্য এসেছি। এমন সময় দেখা হয়ে গেল রিপনের সাথে একই দোকানে। আমি তো তাকে না চেনার ভান করে আছি। কারণ এখানে তার দিকে তাকানো বা তার সাথে কথা বলা মানে নিজের জীবন বিপন্ন করা। তাই স্বাভাবিকভাবে থাকলাম। কিন্তু রিপন এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে যেনো সে আমাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে। এমন মুহূর্তে রিপনকে কথা বলা থেকে বিরত রাখার সুযোগও নেই। আশেপাশে লোকজন সব পাহাড়ি, সাথে মামা ও তার মদখোর বন্ধু বিভাস। মামার বন্ধু সবসময় আমাকে চোখে চোখে রাখে। সে এ অঞ্চলের একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতা। আমার দিকে তার তীক্ষ্ণ নজর থাকে। এই পরিস্থিতিতে বাঙালির সঙ্গে কথা বলা মানে পিঠের চামড়া তোলা আর কলঙ্ক গায়ে মাখা। কৌশলে রিপনের পাশে দাঁড়িয়ে আমার মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে রিপন দেখার মতো করে লিখলাম: “Pls… রিপন এখন এই মুহূর্তে কথা বলিও না, তুমি কথা বললে আমার সমস্যা হবে। তুমি কী চাও আমার সমস্যা হোক?” রিপন এটা দেখে তার মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে লিখলো, “হ্যাঁ কথা বলবো না ঠিক আছে কিন্তু একটা শর্ত আছে, শর্ত হলো তুমি কালকে আমার দোকানে আসতে হবে।” আমি বাঁচার তাগিদে কোনোকিছু চিন্তা না করেই তার কথায় সায় দিয়ে Ok লিখে এই যাত্রায় বেঁচে গেলাম। এরপর রিপন দোকান থেকে বের হয়ে চলে যায়। আমার মধ্যে সজীবতা ফিরে আসে। তবে এতটা ভয় পেয়েছি, এটা বলে বুঝানো যাবে না। ভয় পাওয়ার কারণ হলো কথিত আছে বাঙালিদের নাকি কমনসেন্স নেই, কখন কী বলে ফেলে বা করে ফেলে। এই ভয়টাই আমার মনে বেশি কাজ করেছিল। যাক, মোবাইলের রিচার্জ কার্ড নিয়ে মামা ও বিভাসসহ ঘরে ফিরে আসি। ঘরে এসে চিন্তায় ও নানান প্রশ্নে পড়ে গেলাম: রিপনের দোকানে যাব নাকি না যাব? ভয়ও কাজ করছিল। কিছুটা সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, গেলে সঙ্গে হেমাকে নিয়ে যাব। একা যাব না, একা গেলে ভয় আর সেদিনের মতো ঘটনার সম্মুখীন হব। এই ভাবনা থেকে সিদ্ধান্ত নিলাম কাল সকাল ১০টায় যাব। কিন্তু হেমাকে আগে থেকে বলা হয়নি, তাই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে হেমার ঘরে চলে গেলাম। এখন ভয় পাচ্ছি হেমাকে বলবো কী না? যদি আবার হেমা কাউকে বলে দেয়। ভাবলাম বিনয়ের সঙ্গে হেমাকে বলব, যাতে সে কাউকে কিছু না বলে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। হেমাকে সবার থেকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে বিস্তারিত ঘটনা বললাম। হেমা রেগে তেলেবেগুনে আগুন। সে বলে ওঠলো, “হত্তোর বাচ্চুনি সেদেলার বাঙাল্যের চেদর লের হেয়জ!” সে আরো বললো “সেটেলার বাঙালিরা খুবই খারাপ, মেয়েদের ধর্ষণ করে, অনেক সময় পাহাড়ি মেয়েদের লাভ জিহাদের মাধ্যমে বিবাহ করে কিছুদিন পর ছেড়ে দেয়। তখন মেয়েরা কোথাও যাবার পথ খুঁজে পায় না।” হেমার এই কথা শুনে কিছুটা ভয়ও পেলাম এবং অবাক হলাম। ভাবলাম, বাঙালিরা এতো খারাপ কেন? আর হেমা এসব আমাকে বলে লাভ কী? আমি কী সেটেলার বাঙালিকে ভালোবাসবো নাকি বিবাহ করব? কিন্তু আমি তো একটা ফাঁদে পড়ে গেছি, এটা থেকে নিজেকে রক্ষা তো করতেই হবে। তাই নিরাশ না হয়ে হেমার মন গলানোর জন্য এমনভাবে কান্নার অভিনয় করলাম যাতে মন গলে যায়। একটু অভিনয়ে কাজ হয়ে গেছে। আবেগ আর কান্না দেখে হেমা নিজেই কেঁদে দিল। তাকে পটানোর পর বললাম, চল রিপনের দোকানে যাই। দ্রুত হেমাকে নিয়ে রিপনের দোকানে চলে যাই। রিপন আমাদেরকে দেখে অনেক খুশি হয়। সে ফুল দিয়ে আমাদের স্বাগত জানায়। আমাদের জন্য হরেক রকমের নাস্তার আয়োজন করে। তার আপ্যায়ন দেখে আমরা মুগ্ধ হই। বেশ করে সে এত ভদ্র ও বিনয়ী, তা আগে জানা ছিল না। নারীকে সে এত সম্মান করে, এটা বিশ্বাস করা ছিল কষ্টসাধ্য। কারণ তার পূর্বের আচরণ তাকে আমার কাছে চরিত্রহীন ও অসভ্য হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। আজকে সে স্পেশালভাবে আমাকে একটি ফুল দিয়ে প্রপোজাল দেয়। আমি তা গ্রহণ করিনি, জাতি, ধর্ম ও পার্থক্য বিবেচনা করে। আমি তাকে সাফ জানিয়ে দিই, জাতি ধর্ম ছেড়ে বেজাতি বাঙালি ছেলেকে গ্রহণ করতে পারব না। আমার এই কথা শুনে রিপন যেমন কষ্ট পেয়েছে, তেমনি হেমাও কষ্ট পেয়েছে। হেমাও চেয়েছিলো আমি যেনো প্রপোজাল অ্যাকসেপ্ট করি। লক্ষণীয় বিষয়, রিপন খুব লজ্জা পেয়েছে এবং মন খারাপ করে আনমনা হয়ে গেছে। আমরা আসার সময় সে কিছু কসমেটিক্স আমাদের দু’জনকে দিল। আমি নিতে চাইনি। কিন্তু হেমার রিকোয়েস্টে নিতে বাধ্য হলাম।
কসমেটিক্স নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম। বাসায় এসে নিজেকে অসহায় ও অপরাধী মনে হল। কারণ, রিপনের প্রপোজাল অ্যাকসেপ্ট করিনি। আবার তার কসমেটিক্স নেওয়া কী ঠিক ছিল? এসব কিছু ভাবতে লাগলাম। এভাবে দুই-তিনদিন কেটে গেল। কিন্তু আমি এখন আগের মতো নেই। প্রতিটি মুহূর্তে রিপনের কথা মনে পড়ে। রিপন ছেলেটি দেখতে অতটা সুন্দর নয় এবং অতটা স্মার্টও নয়। তবে চেহারাটা মায়াবী এবং চোখ দু’টি অসাধারণ। মনে হয় তার দু’টি চোখ দিয়ে সে আমাকে যখন দেখে তখন ধর্ষণ করে আর গিলে ফেলে। চোখের সৌন্দর্যটা এই জন্য বর্ণনা করলাম, কারণ আমাদের পাহাড়ি ছেলেদের চোখ ছোটছোট ও ভাসা ভাসা হয়। দেখতে বাঙালিদের চোখের মতো অতটা সৌন্দর্য নয়। এখন রিপনের প্রতি আমার যে ভালো লাগাটা কাজ করছে, সেটা হচ্ছে তার ভদ্রতা ও চোখ দু’টো। আগের মতো তার প্রতি ক্ষোভ অভিমান নেই। এখন আছে শুধু তার প্রতি সহানুভূতি ও ভয়। তার চোখের দৃষ্টি আমাকে রাতের স্বপ্নে অনুসরণ করত, আর আমি ভাবতাম, এ কীসের টান?
এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই সুন্দর একটা ঘুম এল এবং রাত শেষ সকাল হল। সকালে ঘুম ভাঙলো হেমার ডাকে। হেমা এসেই রিপনের প্রশংসা করতে শুরু করল। রিপন এত ভালো ও বন্ধুসুলভ, সেটা নাকি হেমাও জানত না। কিন্তু রিপনের এমন সম্মান প্রদর্শন হেমাও অবাক হয়েছিল। মূলত এই কারণে হেমা আমার সামনে রিপনের প্রশংসা করে অতিবেশি। তার কথায় যেন আমার মনের দ্বন্দ্ব আরও বাড়িয়ে তুলল, কিন্তু সেই সাথে একটা মিষ্টি অনুভূতি জাগাল।
কয়েকদিন অতিবাহিত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিলাম রিপনের দোকানে যাব। হেমাকে নিয়ে দোকানে গেলাম। আমাদেরকে দেখে যেনো রিপনের মরা প্রাণ জীবিত হল! এত খুশি সে আমাদের দেখে হয়েছে, যেটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। রিপন নাকি ভেবেছিল আমরা নাকি আর তার দোকানে যাব না। আমাদেরকে দেখে নাকি সে চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার কাছে নাকি সব অবিশ্বাস্য! রিপন বলল, ১৪ তারিখ নাকি তার বোনের বিয়ে, তাই অনুষ্ঠান আছে। আমরা যদি যেতে আগ্রহী হই তাহলে সে আমাদের নিমন্ত্রণ করবেই। জিজ্ঞাসা করলাম তোমার বাসা কোথায়? সে জানাল গাইবান্ধা জেলা। নামটা মনে হয় জীবনে প্রথম শুনলাম। তাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম এখান থেকে কত দূর বা কত সময় লাগে? সে বলল প্রায় ১ দিন সময় লাগে। বললাম এতদূর যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাছাড়া বর্তমানে স্কুল খোলা আর এতদূর ঘর থেকেও যেতে দেবে না আর ওখানে কোনো পাহাড়ি নেই। বাঙালি একটা ছেলের সাথে এত দূর যাওয়া নিরাপদ নয়। কারণ বাঙালি ছেলেরা নাকি মেয়েদের বিক্রি করে দেয়। এমন সব নানান চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আমাদের কিছুটা নীরবতা দেখে রিপন বলল, ভয় পেলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি আমার কারণে তোমাদের ক্ষতি কোনো হবে না, তোমাদের সম্পূর্ণ সেফটি আমি দেব। তোমাদের মতো আমারও ছোট বোন আছে, আমি তোমাদের কোনো ক্ষতি হতে দেবো না। তোমরা সর্বোচ্চ দুই-তিনদিন থাকবে। তারপর চলে আসতে পারবে। যাতায়াতের সম্পূর্ণ খরচ আমি বহন করব। কিন্তু আমাদের কী যাওয়া সম্ভব? হেমাকে প্রশ্ন করলাম এতদূরে বাসায় কী বলে যাব? হেমা বলল, তুই তোর নানুকে বল রাঙ্গামাটিতে মা-বাবাকে দেখতে যাবি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গাইবান্ধা যাব আর আমি ঘরে মাকে বলব রাঙ্গামাটি তোদের বাসায় বেড়াতে যাব। এই কথা শুনে আমি অবাক হলাম! হেমা মেয়েটার মাথায় এতসব পাকা বুদ্ধি কীভাবে জন্মায়! এত বুদ্ধি নিয়ে সে কীভাবে থাকে? হেমার কথা মতো রিপনকে যাওয়ার কিছুটা সম্মতি দিলাম। কিন্তু একটা শর্ত বেঁধে দিলাম। শর্তটা হলো রিপনকে অবশ্যই তার পরিচয় ও বাড়ি ঠিকানা আমাদেরকে সরবরাহ করতে হবে। এই কথা আমরা মুখ থেকে বের করতে দেরি, সে সাথে সাথে তার ভোটার আইডি কার্ড ও দোকানের ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যাংক চেক আমাদের দিয়ে দিল।
রিপন তার পরিচয় নিশ্চিত করার কারণে তার প্রতি আমাদের বিশ্বাস স্থাপন হল। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো নানিয়ারচর থেকে কীভাবে যাব? যদি পাহাড়ি ছেলেরা দেখে বা কেউ দেখে ফেলে তাহলে তো সর্বনাশ। হেমা বললো আমরা রিপনের সঙ্গে নানিয়ারচর থেকে একসাথে যাব না। আমরা দু’জন বাসে বা সিএনজি যোগে চট্টগ্রাম চলে যাব। চট্টগ্রাম গিয়ে রিপনের সাথে একত্র হয়ে গাইবান্ধা যাব। যেমন ভাবনা তেমন কাজ, রিপন বললো দারুণ বুদ্ধি তো। আলোচনার এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হলো, যেহেতু ১৪ তারিখে তার বোনের বিবাহ তাই দু’দিন আগে ১২ তারিখ যেতেই হবে। এই কথাতে সম্মতি দিয়ে আমরা দোকান থেকে বাসায় যাব বলে বিদায় নেওয়ার সময় চট্টগ্রাম পর্যন্ত যাওয়ার অগ্রিম গাড়িভাড়া বাবদ রিপন আমাদের হাতে ৫ হাজার টাকা ধরিয়ে দিল! এই টাকা হাতে নিয়ে আমার মনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি জাগল—যেন এটি শুধু ভাড়া নয়, একটা প্রতিশ্রুতির প্রতীক। পাহাড়ের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি ভাবলাম, এই যাত্রা কি আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে?
তৃতীয় পর্ব:
ভাড়ার টাকা যেহেতু দিয়েছে, এবার তো যেতেই হবে। আমরা এখন অপেক্ষা করতে লাগলাম ১২ তারিখের জন্য। কবে আসবে ১২ তারিখ, এজন্য দিন গুনতে লাগলাম। এরমধ্যে রাঙ্গামাটিতে যাব এই কথা নানুকে বলে রেখেছি। তাই আর কোনো প্রকার বাধা থাকল না। অপেক্ষার প্রহর গুনে ১২ তারিখ সকালে হেমা ও আমি সেজেগুজে নানিয়ারচর থেকে চট্টগ্রামের বাসে উঠলাম। চট্টগ্রাম অক্সিজেন এসে কথা অনুযায়ী দেখা পেলাম রিপনের। সে পূর্ব থেকে মাইক্রো গাড়ি প্রস্তুত করে রেখেছে। আমাদের অক্সিজেন বাস কাউন্টার থেকে রিসিভ করেই দ্রুত মাইক্রোতে উঠিয়ে নেয়। মাইক্রোতে রিপন চেয়েছিল আমাদের সাথে বসার জন্য। কিন্তু আমি সম্মতি দিইনি। তাই সে চালকের পাশের সিটে বসল। আমি ও হেমা তাদের পিছনের সিটে বসেছি। অনেক দূরের পথ পাড়ি দিয়ে রিপনদের গাইবান্ধা জেলায় পৌঁছালাম। গাইবান্ধা শহরটা উন্নত হলেও রিপনের এলাকাটা একদম গ্রামাঞ্চল। আমাদের জন্য এলাকাটা একদম অচেনা। এলাকাটি ভয়ানক মনে হল। কিছুটা মন খারাপ হয়েছিল ওই সময়। একদম চুপচাপ থাকলাম, তবে দু’জনের মন খারাপ হয়ে যায়। কারণ অচেনা বাঙালি ছেলে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রামের মেঠোপথ ধরে। একদম গ্রাম আর গ্রাম, চারপাশে সারি সারি পাটের ক্ষেত। পুরো গ্রাম শুনশান নীরবতা। মনে হচ্ছে রিপন আমাদের ধোঁকা দিয়ে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে। এমন চিন্তা-ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। একপ্রকার আমি তো কেঁদে দিয়েছি। আমার কান্না দেখে রিপন ভয় পেয়ে যায়। সে বলে, “তুমি কান্না করো না। তুমি কান্না করলে মানুষ অন্য কিছু মনে করবে। মানুষ ভাববে আমি তোমাদের অপহরণ বা জোরপূর্বক নিয়ে যাচ্ছি। আমি গণধোলাই খাব। এবং সব এলাকায় কিছু খারাপ লোক থাকে, তারা তোমাদের ক্ষতি করবে। তাই কান্না না করে দ্রুত বাড়ি চলো। আমি নানিয়ারচরে লাখ লাখ টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য রেখেই তো এসেছি। এমনকি তোমাদের ঘরেই তো আমার পরিচয়পত্র, ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যাংক চেক বই জমা আছে। সেসূত্র ধরে তো তোমাদের এবং আমাকে খুঁজে বের করা খুব সহজ পথ। আমি তোমাদের ক্ষতি করে কী বাঁচতে পারব?” এই কথা স্মরণ করে দেওয়ায় কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। নীরব হয়ে হাঁটা শুরু করলাম অচেনা মেঠোপথ ধরে। কিছু পথ যেতেই রিপনের বাড়ি এল। ওখানকার বাঙালিগুলো আমাদেরকে দেখে চাইনিজ মেয়ে, জাপানি মেয়ে, বিদেশি মেয়ে বলতে লাগল! বিষয়টি কোনোভাবেই আমার কাছে ভালো লাগল না। তারা যেভাবে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে মনে হল আমরা ভিনগ্রহের বাসিন্দা! যাক, এসব পরোয়া না করে দ্রুত চলতে লাগলাম রিপনের ঘরের আঙিনার দিকে। গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে আমি লক্ষ্য করলাম, এখানকার প্রকৃতি আমাদের পাহাড়ের মতো নয়—সমতল, বিস্তৃত ক্ষেত, আর দূরে দূরে গাছপালা। এই অচেনা পরিবেশ আমাকে আরও ভয়ানক লাগছিল, কিন্তু রিপনের কথাগুলো আমাকে ধৈর্য ধরতে সাহায্য করল।
রিপনের ঘরের আঙিনা বোনের বিবাহ ও আমরা আসার কারণে নতুনভাবে সেজেছে। ঘরের ও গ্রামের আশেপাশের নারী-পুরুষ দেখে মনে হল উপস্থিতির সংখ্যা ২০০ জন হবে। আমাকে ও হেমাকে দেখে সবাই উচ্চ অভ্যর্থনা জানাল। একদম উৎসবের আমেজের পরিবেশ। কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু আমরা। কারণ এ অঞ্চলের মানুষগুলো কখনো চাকমা দেখেনি। তাই তাদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা আমাদের নিয়ে। কিন্তু আমরা আঙিনার শত আয়োজন রেখেই ক্লান্ত শরীরে সিকিউরিটি সম্পূর্ণ একটি নিরিবিলি রুমে ঢুকে গেলাম। সে রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিলাম। বিশ্রাম শেষে দুপুরে খাওয়ার জন্য ডাক পড়ল। রিপন ১৮/১৯ বছর বয়সী দু’টা মেয়ে নিয়ে এসে অট্টহাসি হেসে বলল, “এখনো ভয় করছে তোমাদের?” হেমা বলছে, “ভয় করছে না। তবে তোমাদের বাঙালিদের স্বভাব-চরিত্রটা তো অতো ভালো নয়। নারী ধর্ষক বেশি। মানুষ হত্যা ও অন্যায়-অবিচার বেশি করে। তাই সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। কিন্তু তোমার প্রতি আমাদের বিশ্বাস আছে কারণ এই পর্যন্ত তোমার সবকিছু ঠিকঠাক আছে। আমাদেরকে যে রুমটা দিয়েছ তা এককথায় চমৎকার এবং সিকিউরিটি সম্পূর্ণ মনে হল।” আমাদের মুখ থেকে এ কথা শুনে রিপন ভীষণ খুশি হয়েছে। মনে হচ্ছে সে মহাকাশ জয় করে এসেছে! রিপন সাথে করে নিয়ে আসা মেয়ে দু’টোকে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, “ওদের একজনের নাম মিতালী চাকমা, অন্যজনের নাম হেমা চাকমা। কোনো পুরুষ মানুষ বা অন্য কেউ যেনো তাদের রুমে আসতে না পারে এবং কোনো সমস্যা যেনো না হয়। এজন্য তোমরা দু’জন তাদের গার্ড হিসেবে সার্বক্ষণিক থাকবে। এদের কিছু হলে তোমাদের নিস্তার হবে না। মেহমানদের প্রয়োজনীয় যা কিছুই লাগে তা সাথে সাথে দিবে এবং রুম থেকে বের হলে এদের সাথে সাথে লেগে থাকবে।” এই বলে আমাদেরকে ডাইনিং রুমে নিয়ে গেল। ডাইনিং রুমে যারা আপ্যায়নের কাজে নিয়োজিত ছিল তাদেরকে লক্ষ্য করে বলল, “১০ মিনিট পরে টেবিলে খাবার নিয়ে আসার জন্য। এই ১০ মিনিট পরিচয় পর্ব সেরে নিবে।” এই ফাঁকে একটা তথ্য দিয়ে রাখি রিপন ও তার পরিবার সম্পর্কে। রিপনরা গ্রামে বসবাস করলেও তারা ওই গ্রামের প্রভাবশালী। একসময় তার বাবা ছিলেন নাকি গাইবান্ধা জেলার প্রভাবশালী নেতা। এলাকার সামাজিক বিচার-আচারসহ প্রায় সবকিছুতে রিপনদের পরিবারের আধিপত্য বেশি। বলা যায় ওই এলাকার সবকিছুর নিয়ন্ত্রক তারা। এলাকার অন্যান্য ঘরগুলোর মধ্যে রিপনের ঘরটি সবচেয়ে আলাদা। ঘরকে নান্দনিকভাবে সাজিয়েছে। কথায় আছে না, বড় লোকের বিরাট কারবার। তারাও তাই। তাদের ঘরে ছিল একটা সমৃদ্ধির ছাপ, যা আমাদের পাহাড়ি ঘরের সরলতার সাথে মিলিয়ে দেখলে অদ্ভুত লাগত।
রিপনরা ৩ ভাই ও ১ বোন। রিপন সবার বড়, বোন দ্বিতীয়, আর দু’টি ভাই ছোট। পরিবারে রয়েছে—মা-বাবা ও তারা ৪ ভাই-বোন। রিপন ব্যবসায়িক কারণে থাকে রাঙ্গামাটি নানিয়ারচরে। তার মামা সরকারি চাকরিজীবী। একসময় নানিয়ারচর উপজেলা সমাজসেবা অফিসে চাকরি করতেন। মামার সূত্র ধরে তার মূলত নানিয়ারচর যাওয়া। এবং অদূরে দোকান করা। রিপনদের ডাইনিং রুমটা বিশাল। এককথায় সভা-সেমিনার রুমের মতো। চারপাশে ঘুরানো ডাইনিং। যারা ডাইনিং-এ রয়েছে তারা সবাই রিপনদের পরিবারের সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন। তাই সবার সাথে সবার পরিচয়টা হওয়া জরুরি। রিপন প্রথমে রিপনের মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তবে আমার কাছে কেন জানি মনে হল রিপনের মা তেমন একটা খোলা মনের না। যেকোনো কাউকে সহজে মেনে নিতে তার কষ্ট হয়। তাই দু-চারটা কথা বলে শেষ করলেন। কিন্তু তার ভাই-বোন খুব প্রাণবন্ত, আড্ডাবাজ আর তাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনগুলোও খুব আন্তরিক। সবার সাথে পরিচয় শেষ করে খেতে বসলাম। বিভিন্ন ধরনের তরকারি আইটেম ছিল, যা আমরা পূর্বে দেখিনি। তারা আপ্যায়নে ঘাটতি রাখেনি। খাবারের স্বাদ ছিল অনন্য—মশলার মিশ্রণ, মাংস, মাছের তরকারি, আর মিষ্টির বৈচিত্র্য যেন আমাদের পাহাড়ি খাবারের সাথে এক নতুন মিলন ঘটাল।
রাত শেষ হলে রিপনের বোন সামিয়ার বিবাহ। তাই সবাই ওদিকে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। রিপনের বোন উচ্চশিক্ষিত। যে ছেলের সাথে বিয়ে হচ্ছে সে নাকি একটু উশৃঙ্খল স্বভাবের এবং ফার্মেসি ওষুধ বিক্রেতা। এই বিয়েটা নাকি শুধু রিপনের খালা ও তার বাবার চাপের কারণে হচ্ছে। না হয় এমন ছেলের সঙ্গে বিবাহ হতোই না। পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য এই বিবাহে অমত। তারপরও ঠিকঠাক মতো বিয়ের আয়োজনটা হল। জামাই পক্ষ এসে খেয়ে গেল, আনন্দ ফুর্তি করল। এদিকে আমরাও জামাইয়ের বাড়িতে গেলাম, কিন্তু জামাই ভালো না হওয়ার কারণে মেয়ে পক্ষকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। মেয়েদের পক্ষের অতিথিরা কে খাবার খেলো আর কে খেল না তার কোনো খবরই তারা রাখেনি। বুঝা গেল জামাই খুবই উশৃঙ্খল প্রকৃতির এবং তার মা-বাবা ও ভাই-বোন অহংকারী। পারিবারিক ও সঠিক শিক্ষা নেই। শুধু মাত্র এখানে রিপনের খালা ও বাবার চাপের কারণে বিবাহটা হচ্ছে। এলাকাবাসীসহ সবাই বলাবলি করছে ছেলে পক্ষ নাকি অমানুষ। এত সুন্দর, ভদ্র, উচ্চশিক্ষিত মেয়েটাকে অমানুষের হাতে তুলে দিল। মেয়েটি নির্যাতনের শিকার হবে। যাক, এই পর্ব শেষ করি, এটা তাদের পারিবারিক বিষয়। বিবাহের অনুষ্ঠানে আমি লক্ষ্য করলাম, বাঙালি বিবাহের রীতি আমাদের থেকে কতটা ভিন্ন—রঙিন সাজসজ্জা, গান-বাজনা, আর সবার মিলিত আনন্দ যেন একটা স্বপ্নের মতো লাগল।
চতুর্থ পর্ব:
রিপনের বোনের বিবাহ শেষ করার পর তাদের ঘরের অধিকাংশ অতিথি চলে গেছে। বেশ করে যে প্রচণ্ড ভিড় ঘরে ছিল, সেটা এখন আগের মতোই নেই। পরিবেশটা শান্ত। এখন রিপন ও তার পরিবারের সদস্যরা আমাদের আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে গেল। মনে হচ্ছে আমরা তাদের বিশেষ কেউ। তাদের গ্রাম ও বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রতিদিন মানুষের ঢল নামে আমাদের দেখতে। আমরা ৩/৪ দিনের জন্য গিয়ে প্রায় ৮ দিন ছিলাম। এই ৮ দিনে অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হল। বাঙালিদের মধ্যে যে খারাপ আছে, সেটার প্রমাণ আমরা পেলাম। বস্তুত অধিকাংশ বাঙালিরা নারী লোভী, এটা একদম সত্য নয়। পেছন থেকে নারীদের প্রতি বাজে মন্তব্য ও খারাপ চিন্তাধারায় বাঙালিরা সবসময় বিভোর থাকে, সেটা অবশ্যই ঠিক। তা বাঙালি সমাজে অবস্থান করে বুঝতে পেরেছি। এখানে সবচেয়ে বড় সত্য হলো বাঙালিদের মধ্যে সবাই খারাপ নয়। আমাদের পাহাড়ি সমাজে একটা প্রবাদ বা বার্তা সময় থেকে থাকে: বাঙালিদের মা দিলে বাপ হয় না, বোন দিলে দুলাভাই হয় না। আসলে এটা ডাহা মিথ্যা এবং একটা অপপ্রচার বাঙালিদের প্রতি। আমি এই গ্রামে এসে দেখেছি বাঙালিদের মধ্যে অনেকেই আছেন খুবই ভালো। তারা নারীদের সম্মান করে এবং ধর্মের প্রতি ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসী। তারা অন্যায় কাজ করে না, নারী অতিথিদের প্রতি অনেক দায়িত্ববান ও কর্তব্যবান। গ্রামের মানুষ অল্প সময়েই আমাদের সঙ্গে মিশে গেছে। প্রতিদিন সকালে গ্রামের নারীরা এসে আমাদের সাথে গল্প করত, তাদের জীবনের কথা শোনাত, আর আমরা আমাদের পাহাড়ের গল্প বলতাম। এতে করে একটা সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছিল, যা আমার মনে চিরকালীন হয়ে রইল।
গ্রামের বাঙালি যুবতী মেয়েগুলো খুব পর্দাশীল। চলাফেরায় খুব সতর্কতা অবলম্বন করে। প্রকাশ্যে পুরুষদের সাথে নারীরা চলাফেরা করে না। কিছু খারাপ বাঙালির কারণে আমরা বাইরে থেকে শুনি বাঙালিরা অনেক খারাপ, মা-বোন সবাইকে ধর্ষণ করে। আসলে এসব ভুলভাল তথ্য। এর বিন্দুমাত্র সত্যতা নেই। সব অহেতুক কথাবার্তা। বাস্তবিক অর্থে বাঙালি সমাজব্যবস্থা ও ধর্মব্যবস্থা খুবই কঠিন অনুশাসন, নারী-পুরুষ অবাধে চলাফেরা করতে পারে না এবং অশালীন কাজের প্রতি কঠোর। যা বাঙালি সমাজে না থাকলে জানতে পারতাম না। যদি গাইবান্ধা না যেতাম তাহলে বাঙালিদের প্রতি আমাদের একটা ভুল ধারণা থেকে যেত। বাস্তবতা হলো বাঙালিরা আমাদের মতো রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। তারা অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও হালাল পথের অনুসারী। বাঙালি নারীদের রান্না-বান্না ও সাংসারিক কাজ খুব গোছানো এবং পরিচ্ছন্ন। সবসময় পাক-পবিত্রতা রক্ষা করে চলে। পুরুষরাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে ভালো-খারাপ সব জাতিতে থাকে। আমাদের পাহাড়িদের মধ্যেও সবাই সাধু না। হয়তো কোনো জাতিতে খারাপ বেশি বা কোনো জাতিতে খারাপ কম। পার্থক্য শুধু এতটুকু। ৮ দিন থাকার পর আমরা ২১ তারিখ গাইবান্ধা থেকে চলে আসি। চলে আসার সময় শতশত নারী-পুরুষ ও যুবক-যুবতী আমাদের বিদায় জানায়। বিদায় বেলায় তাদের যেমন মন খারাপ হয়েছে, ঠিক আমাদেরও মন খারাপ হয়েছে। একদম মনটা খারাপ করে আসতে হয়েছে। ওদের ছেড়ে আসতে ইচ্ছে করছিল না। বেশ করে আমাদের সাথে কম কথা বলা রিপনের মা নিজেই কেঁদেছেন আসার সময় জড়িয়ে ধরে। বলেছে, “আমার মতো মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে সে বরণ করতে প্রস্তুত।” তবুও পড়াশোনার কারণে এবং বাসায় জেনে যাবে সেই ভয়ে চলে আসতে বাধ্য হলাম। গাড়ি করে আসার সময় রিপন আমার সাথে বসার চেষ্টা করে কিন্তু আমার চোখ রাঙানি দেখে সে চালকের সিটে চলে যায়। যাত্রাপথে আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ভাবলাম, এই যাত্রা আমাকে কতটা বদলে দিল—ভয় থেকে বিশ্বাসে, অজানা থেকে পরিচিতিতে।
নানিয়ারচর আসার পর ভয়ে ছিলাম নানু বা মামা কিছু জানল কী না? আমি বাড়িতে যাব বলেছি। কিন্তু বাড়িতে যায়নি, কেউ কিছু বলে দিয়েছে কী না এমন চিন্তা ঘুরপাক। নাকি মা আসছে নানুর বাড়িতে, এই ভয় কাজ করেছিল বেশি। এরপর নানুর কাছে গিয়ে দেখি নানু স্বাভাবিক। নানু হেসে হেসে বলে, “৩/৪ দিনের জন্য রাঙ্গামাটি বাড়িতে গিয়ে অনেকদিন থেকে আসলি মিতালী।” আমিও হেসে উত্তর দিলাম, “হ্যাঁ নানু।” সবকিছু ঠিক থাকায় মনে প্রশান্তি এল। বেশ কয়েকদিন ধরে স্কুলে যায়নি তাই পড়াশোনা ফাঁকি দেওয়া বাদ দিয়ে নিয়মিত স্কুলে যেতে শুরু করলাম। পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ দিলাম। কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর রিপনের সাথে দেখা হয়। এরপর থেকে আমাদের নিয়মিত দেখাও হচ্ছে। এসব কারণে কিন্তু আমার পড়াশোনা এবং সবকিছু আগের মতো যাচ্ছে না। কিছুতেই ভালো লাগে না। শুধু আমার রিপনের কথা মনে পড়ে। সারাটা সময় তাকে মিস করি। জানি না এটা তার প্রতি ভালোবাসা ছিল কী না? কেন জানি আমি দিনদিন তার প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। আমি খেতে পারি না। সবসময় শরীর দুর্বল দুর্বল লাগে, নিজেকে অসহায় মনে হয়। সামনে পরীক্ষা। সবকিছুতে অলস লাগে, একটুও ঘুম হয় না আর পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ বসে না। তাই রিপনের সাথে যোগাযোগে দূরত্ব বাড়ালাম। কিন্তু এই দূরত্ব যেন আমার হৃদয়কে আরও কষ্ট দিত, প্রতি রাতে তার স্মৃতি আমাকে জাগিয়ে রাখত।
পঞ্চম পর্ব ও শেষ পর্ব:
এদিকে হেমা নাকি রিপনের দোকানে গেছে। রিপন তার মাধ্যমে খবর দিল ইসলামপুর গিয়ে দেখা করার জন্য। ওদিকে নাকি বাঙালিরা বেশি তাই দেখা করলে সমস্যা হবে না। কিন্তু আমার ভয় করে যদি কেউ দেখে ফেলে। তবুও রিপনের কথা রাখতে গিয়ে ইসলামপুর এক বাঙালি ঘরে আমরা দেখা করি। রিপন হাঁটু গেড়ে বসে ফুল নিয়ে প্রপোজাল দেয়। আমি যাতে না করি সেজন্য সে হেমাকেও রাজি করিয়েছে। কিছুতেই সে আমার থেকে না শব্দ শুনতে চায় না। আমি না শব্দ করলে নাকি সে মরে যাবে। চাকু একটা নিয়েছে হাত কাটার জন্য। কী করব? আমার ধর্ম ও তার ধর্ম আলাদা। সমাজ কী এসব মেনে নিবে? আমি কী তাকে বিবাহ করতে পারব? আমাদের সমাজব্যবস্থা বাঙালিদের সঙ্গে বিবাহ হলে অনেক কঠিন শাস্তির বিধান। তাছাড়া আমাকে নানিয়ারচর কলেজের পিসিপি’র সভাপতি বিভাস চাকমা পছন্দ করে। তাকে আমি পছন্দ করি না, সে বলেছে “আমি যদি অন্য কাউকে বিবাহ করি তাহলে নাকি আমার স্বামী ও আমাকে সে মেরে ফেলবে।” বিভাস চাকমা আবার আঞ্চলিক দলের এক নেতার ছেলে। এলাকায় তাদের প্রচুর দাপট। আমি SSC পাস করলে আমাকে জোর করে বিবাহ করবে। আমি বাঙালিকে ভালোবাসি এটা যদি বিভাস শুনে আমার অবস্থা খারাপ হবে। এটা চিন্তা করে আমি খুব টেনশনে পড়ে গেলাম। কিন্তু সামনের পরিস্থিতি অথাৎ রিপনের কৌশলের কাছে আমি হেরে গিয়ে তার প্রপোজাল অ্যাকসেপ্ট করি। সেদিন অশ্রু টলটল করিয়ে রিপন আমাকে তার প্রেমের সাগরে ভাসায়। কিন্তু রিপন শর্ত দেয় তার সাথে প্রতিদিন দেখা করতে না পারলেও অন্তত যাতে দুই-তিন দিন পরপর দেখা করি। সামনে পরীক্ষা যার কারণে আমি রাজি হইনি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগে আমি আর হেমা চলে আসি বাড়িতে। সেই মুহূর্তে আমার হৃদয় যেন উথাল-পাথাল হয়ে উঠল—ভালোবাসার আনন্দ আর সমাজের ভয়ের মাঝে।
এরপর আমার পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। আমি পরীক্ষা দিলাম। পাস করলাম ঠিক কিন্তু রেজাল্ট তেমন ভালো হয়নি। বকাঝকা খেয়েছি পরিবার থেকে। তাই ২/৩ মাস রিপনের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ করিনি। আর নিজেকে শোধরাবার চেষ্টায় রিপনের সঙ্গে যোগাযোগ কম রেখেছি। কিন্তু আমার মন তো সবসময় রিপনের দিকে। নিয়মিত দেখা করতে না পারার কারণে রিপন খুব রাগ। তাই দেখা করলাম। রিপন বলল, ২৮ তারিখ নাকি তার জন্মদিন। ইসলামপুর একটি বাসায় তার জন্মদিন পালন হবে রাত ৯টায়। আমরা থাকতে হবে। কিন্তু রাতে আমরা কীভাবে থাকব? রিপন বলল যেভাবে হোক থাকতেই হবে। জন্মদিনে আসার জন্য আমি নানুকে বললাম আজ রাতে হেমাদের ঘরে থাকব। নানু বললো আচ্ছা। হেমাও বললো আজ রাতে আমাদের ঘরে থাকবে। এই বলে বিকাল ৬টায় দু’জন দু’জনের ঘর থেকে বের হয়ে বাজার থেকে কিছু গিফট নিয়ে ইসলামপুর চলে আসি। ইসলামপুর এসে দেখি রিপন জন্মদিন পালনের জন্য বিশাল আয়োজন করে আছে। আমরা গল্প করতে করতে রাত প্রায় নয়টা হল। ঠিক সময় কেক কেটে তাকে উইশ করলাম। রিপন যেভাবে আমাদের আপ্যায়ন করল মনে হচ্ছে জন্মদিনটা আমাদেরই! সেই রাতে আমরা গল্প করলাম, হাসলাম, আর রিপনের চোখে দেখলাম তার আমার প্রতি অসীম ভালোবাসা।
দিন যত যাচ্ছে ততই আমি রিপনের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি। সারাদিন শুধু রিপনকে ভাবি। আমি তাকে সারাজীবন আপন করে নেওয়ার জন্য সবসময় সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করেছি। এইভাবে আমাদের ভালোবাসা অনেক গভীরে চলে যায়। একটা সময় রিপনের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা পিসিপি’র বিভাস চাকমা জেনে যায়। আমাকে তুলে নিয়ে বিভাস চাকমা নির্যাতন ও অত্যাচার করে। পরবর্তীতে আমাকে ঘরবন্দী করা হয়। আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাকে বিভাস চাকমা বিয়ে করে। বিভাস চাকমা হচ্ছে অকর্মা, মদ, গাঁজাখোর ও উশৃঙ্খল প্রকৃতির। সে সবসময় আমাকে মারধর করে। আমার জীবনটা একদম অসুখী। আমি দাম্পত্য জীবনে সম্পূর্ণভাবে অসুখী। আমি সংসার জীবনে এতটাই অসুখী সেটা লেখার ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। আমি এখনো প্রতিটি মুহূর্তে রিপনকে মিস করি। আমার সাথে যতদিন রিপনের সম্পর্ক ছিল ততদিন পৃথিবীর সমস্ত সুখ আমার ছিল। রিপন এমন বাঙালি যাকে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আপন ও বিশ্বাসী মনে করি। যে আমার জন্য সারাটি জীবন চিরকুমার রয়ে গেলো। আমাকে আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে একটা অসভ্যের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। যেকারণে আজো বিছানায় আমার চোখের জল পড়ে। আমার হৃদয়ের পরতে পরতে রিপন। আমি চোখ দু’টি বন্ধ করলে শুধু রিপনকে দেখি। রিপন যেভাবে আমাকে শিহরিত করেছে সেভাবে আমি আমার স্বামী কর্তৃক শিহরিত হয়নি। আমি এখনো রিপনের স্পর্শকে অনুভব করি। জানি না ভালোবাসা পাপ কী না তবে রিপন আমার জন্য পাপ নয়। আমি এক মহাকাল তাকে ভালোবেসে যাব। আমার আর রিপনের দেখা হয়তো একদিন স্বর্গে হবে।
আমি মনে করি প্রতিটি পাহাড়ি মেয়ের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থাকা উচিত। এই স্বাধীনতা না থাকলে জীবন যেন একটা বন্দিশালা হয়ে যায়, যেখানে ভালোবাসা শুধু স্বপ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। আমার গল্প শেষ হলেও এর শিক্ষা চিরকালীন—ভালোবাসা জাতি-ধর্মের উর্ধ্বে, এটি হৃদয়ের অধিকার।



